জলবায়ু সংকটের কারণে বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। গলছে বরফ, বাড়ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা। মানুষকে আরও বেশি সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়া ও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী ম্যালেরিয়ার উপদ্রব বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোয় জলবায়ুর বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ার সামর্থ্য এখনো তৈরি হয়নি। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও অনাবৃষ্টি, আবার কোথাওবা খরা, অর্থাৎ একেক এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভিন্ন রকম। মানুষ নগর গড়তে প্রকৃতি উজাড় করছে। ফলে বদলে যাচ্ছে জলবায়ু। এভাবে মানুষ নিজেই তার অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় সবার আগে প্রয়োজন মানুষকে সচেতন করা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিপর্যয় এড়াতে হলে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। নিশ্চিত করতে হবে, যেন ২১০০ সাল পর্যন্ত সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে। এই শতকেই পৃথিবী থেকে সাড়ে ৫০০ প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়াই বৈশ্বিক উষ্ণতায়ন দুর্যোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। এক দশক ধরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে ১০ শতাংশ মানুষ পানির সংকটের মধ্যে আছে। ২০৫০ সাল নাগাদ তা বেড়ে ২৫ শতাংশ হতে পারে। বাংলাদেশের উজান থেকে আসা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বন্যার ভয়াবহতা বাড়তে পারে। অনেক দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ‘নেট জিরো’ পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইতোমধ্যে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে জলবায়ুবিষয়ক কপ২৮ সম্মেলনের পর্দা উঠেছে গত বৃহস্পতিবার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতৃস্থানীয়রা এতে অংশ নিয়েছেন। এরই মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মুখে থাকা দুর্বল দেশগুলোর জন্য তহবিলের ঘোষণা এসেছে। আশার কথা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাস ও মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) মার্কিন ডলারের একটি তহবিল পাচ্ছে।
১৩০টিরও বেশি দেশ নিজেদের জলবায়ু পরিকল্পনায় খাদ্য ও কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উপায় খুঁজতে যখন বিশ্বনেতারা দুবাইয়ে কপ২৮ জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে সমবেত হয়েছেন, তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটি আমেরিকার বিখ্যাত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন নিউজউইকে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে ‘লেটস পুট ব্যাক পিপল অ্যাট দ্য হার্ট অব ক্লাইমেট অ্যাকশন’।
জলবায়ু পরিবর্তন হলো একটি বৈশ্বিক বিপর্যয়, যা গরিবদের ওপর ধনীরা চাপিয়ে দেয় এবং ক্রমবর্ধমান হারে এটি তাদের নিজেদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জনপদের ওপর টাইফুন, বন্যা এবং খরার কারণে ফসল উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ক্ষুধা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু তহবিলের একটি ক্ষুদ্র অংশই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করা লোকদের কাছে পৌঁছায়। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রথম সারিতে থাকা মানুষকে রক্ষায় সাহায্য না করলে বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য একত্রিত হতে এবং তাদের নিজস্ব প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নে উৎসাহিত এবং ক্ষমতায়িত করতে হবে। জাতিসংঘের জলবায়ু তহবিলসহ নানা খাত থেকে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য তহবিল বাড়াতে হবে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কমিউনিটির জন্য অর্থপ্রবাহ এবং স্থানীয়ভাবে নেতৃত্ব ও কার্যকর অভিযোজন নিশ্চিত করতে হবে।
গ্রিন হাউস অ্যাফেক্টের কারণেও জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। তথ্য বলছে, বায়ুমণ্ডলে অন্যতম একটি গ্রিন হাউস গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ঊনবিংশ শতকের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। গত দুই দশকে বেড়েছে ১২ শতাংশ। শক্তি উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এতে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন, মিথেনসহ নানা ধরনের ক্ষতিকারক গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হচ্ছে। অন্যদিকে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় ওই সব অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি মনুষ্যসৃষ্ট কারণ হলো অতিমাত্রায় বৃক্ষনিধন এবং নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন। ক্ষতিকর গ্যাস প্রতিনিয়ত শিল্পকারখানা থেকে নির্গত হয়ে পরিবেশ বিপর্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি রোধে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। অধিক পরিমাণে বৃক্ষরোপণ করতে হবে এবং ক্ষতিকর গ্যাসের ব্যবহার রোধ করতে হবে। তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।