পেঁয়াজের বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীরা এক রাতে দ্বিগুণ দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাজারের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সরকারপ্রধান গত শনিবার সংশ্লিষ্টদের কাছে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ জানতে চেয়েছেন। তিনি জরুরি ভিত্তিতে দাম কমাতে ব্যবস্থা নিতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এই নির্দেশনার প্রতিফলন বাজারে নেই। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বিক্রেতারা যার কাছ থেকে যা নিতে পারছেন, তারা তা-ই নিচ্ছেন। কোনো নিয়মনীতির বালাই নেই। এক রাতেই দাম বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ১৩০ টাকার দেশি পেঁয়াজ দুই দিনের ব্যবধানে ২৪০ টাকা কেজি হয়ে গেছে। এভাবে বাজারে স্বেচ্ছাচারিতা বিরাজ করলেও আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী কেউ দায় নিতে চাইছেন না। বরং একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে দিচ্ছেন। খবরের কাগজ পত্রিকায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে।
জানুয়ারিতে দেশি পেঁয়াজ ওঠার সময় বিভিন্ন বাজারে খুচরা পর্যায়ে ২৫-৩০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এপ্রিলে ৩৫-৪০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। এর আগে গত অক্টোবরে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির শুল্ক বাড়িয়ে ৮০০ ডলারে টন নির্ধারণ করলে হঠাৎ করে ১০০ টাকার ওপরে উঠে যায় পেঁয়াজের দাম। দেড় মাস থেকে ১১০-১৪০ টাকার মধ্যে থাকলেও হঠাৎ করে আবার ২০০ টাকা ছাড়িয়ে ২৪০ টাকা পর্যন্ত কেজি বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা। গতকাল শনিবার ভারতের আমদানি করা পেঁয়াজ আড়তে ১৫০-১৫৫ টাকা, পাইকারিতে ১৬০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ১৮০ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
এরই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে দেশি পেঁয়াজের দাম। তথ্যমতে, দেশে পেঁয়াজের মোট চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদন ৩৫ লাখ টনের মতো। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ ক্ষতি হলেও ২৫ লাখ টনের মতো থাকে। আর আমদানি করতে হয় ছয় থেকে সাত লাখ টন। এখন প্রশ্ন হলো, দেশি পেঁয়াজের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও ভারতের পেঁয়াজের সঙ্গে কেন এই প্রতিযোগিতায় নামতে হলো?
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলছেন, ‘আমাদের কিছু করার নেই। যা করার এলসি যারা করছেন, তারাই এ সুযোগ নিচ্ছেন। তারাই কাছাকাছি অন্য কারও কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এ জন্য দামও বেশি পড়ছে। তাদের ধরলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ খবরের কাগজকে বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে ভোক্তা অধিদপ্তরকে অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া জরুরিভাবে পেঁয়াজ আমদানির বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করেছি। আশা করি এতে দাম কমবে।’
পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার কারণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজধানী ঢাকাসহ আট জেলায় ৫৭টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এর পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
ভোক্তাদের দুর্ভোগ এমনিতেই চরমে। বাজারে নিত্যপণ্যের যেমন দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি পেঁয়াজ কিনতে টাকার অঙ্কটা যেন মাত্রা ছাড়িয়েছে। তথ্য বলছে, আশাব্যঞ্জক ফলন দুই বছর ধরে হয়েছে। দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারে উঠতে শুরু করলেও দাম কেন বাড়ছে? কারসাজিতে রয়েছেন মুনাফাভোগী অসাধু ব্যবসায়ীরা। কৃষকরা যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ফাঁদে না আটকে যান, এ জন্য আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুবিধা করে দিতে হবে সরকারকে।
বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। যে বা যারা ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের অজুহাতে দাম বাড়িয়েছে, সেসব চক্রকে চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে দেশের বড় বড় আড়তদারের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। কোনো আমদানিকারক হিসাব ছাড়া বেশি দামে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করলে তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তা হলে পেঁয়াজের বাজারের নৈরাজ্য রোধ করা সম্ভব হবে।