দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের লড়াই মাঠে গড়িয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের পর সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে গত সোমবার থেকে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা যার যার প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে নেমে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী থাকছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন দলের নেতা, বর্তমান সংসদ সদস্যসহ প্রায় ৪০০ স্বতন্ত্র প্রার্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন। তবে প্রচারের শুরুতেই কিছু জায়গায় বিক্ষিপ্ত সংঘাত-সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জননিরাপত্তার স্বার্থে বিজয় র্যালি, মিছিল, শোভাযাত্রা বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কোনো ধরনের মশাল ব্যবহার না করতে সর্বসাধারণকে অনুরোধ করেছে।
অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার ঘটনায় দলটির নেতারা অখুশি নন। বরং নানামুখী চাপ সত্ত্বেও দলটির একটি অংশকে যে নির্বাচনে নেওয়া যায়নি, তাকে বড় ধরনের সফলতা হিসেবে দেখছে বিএনপি। পাশাপাশি জামায়াতসহ শরিক ও সমমনা দলগুলোর নির্বাচনে যাওয়া ঠেকাতে পারার ঘটনায়ও একধরনের স্বস্তি বোধ করছে বিএনপি।
রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে গত ১৫ নভেম্বর সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ১৫টি দল নির্বাচন বর্জন করে রাজপথে আন্দোলনে রয়েছে। অন্যদিকে ২৭টি দল এবারের ভোটে অংশ নিচ্ছে।
সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে। তারা রাজপথের আন্দোলনে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি নির্বাচনকে ‘ভোটারবিহীন’ করার নানা পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ নিয়েছে।
রেলপথের নিরাপত্তায় ২ হাজার ৭০০ জন আনসার সদস্য টহলে থাকবেন। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের তৃণমূলে তথ্য সংগ্রহের জন্য জোরদার হয়েছে কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম। ৭ জানুয়ারি ভোট গ্রহণের আগে ও পরে মিলিয়ে ১৩ দিন সেনা মোতায়েনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে ২৯ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সেনাবাহিনীকে চাওয়া হয়েছে।
২৭টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের পাশাপাশি প্রায় ৪০০ স্বতন্ত্র প্রার্থীও ভোটের মাঠে রয়েছেন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৬৯ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। প্রতীক বরাদ্দের পরপরই রাজধানী ঢাকায় নির্বাচনী এলাকাগুলোয় নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার টাঙানো শুরু হয়। নৌকার ভোটযুদ্ধ এখন স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গেই। নানা আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে প্রার্থীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
রাজধানীতে বিজয় শোভাযাত্রা করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এদিকে বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যুতে বিশ্বের মোড়লরা দ্বিধাবিভক্ত। তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরছেন। বাংলাদেশে আরব বসন্তের মতো কাণ্ড ঘটতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে রাশিয়া। তারা বলছে, প্রতিযোগিতা নয়, তারা বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপতৎপরতা তুলে ধরছে।
নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের পরই নির্বাচনী সফর শুরু করলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। নির্বাচনের জন্য তৈরি আওয়ামী লীগের ইশতেহার ২৭ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হবে। সিলেট থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম দলীয় জনসভা শুরু করেন। কিছুদিন আগে বিচারপতির বাসভবনে হামলা, রেললাইন কেটে নাশকতা, রেলের বগিতে আগুন- এগুলো বৃদ্ধি পেয়েছে। তেজগাঁও স্টেশনে মঙ্গলবার মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের তিনটি বগিতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন চারজন। এ ছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশে গাড়িতে আগুন ও সহিংসতা বাড়ছেই।
এদিকে নির্বাচন নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা। মূলত আওয়ামী লীগের নৌকা প্রার্থীদের সঙ্গে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ফলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূলে বড় বিবাদের আভাস দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশীদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে গিয়ে আন্ত-দলীয় কোন্দল ও বিবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করা যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনও জরুরি। শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে বিদেশিদের কাছে ভিন্ন বার্তা যাবে।’
এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। নির্বাচন যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে জন্য নির্বাচনকালীন সতর্ক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। সংঘাত নয়, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে স্থিতিশীল অবস্থা ফিরে আসবে, সেই প্রত্যাশা।