টানা চতুর্থবারের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলটি ১৫ বছর একাধারে ক্ষমতায় আছে। আবারও নিরঙ্কুশ জয় পেল। গত রবিবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষে বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ফলাফলে ২৯৯ আসনের মধ্যে ২২২ আসনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। জাতীয় পার্টি জয়ী হয়েছে ১১টি আসনে। স্বতন্ত্র জিতেছেন ৬২ জন। এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্রদের জয়জয়কার। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টি তাদের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে কম আসন পেয়েছে। দুই দশক ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকা জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিও গত তিনবারের চেয়ে কম আসনে জয় পেয়েছে। কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি এবং বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। আশাভঙ্গ হয়েছে কিংস পার্টি খ্যাতি পাওয়া কয়েকটি ছোট দলেরও।
এদিকে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর কোনো ধরনের বিজয় মিছিল না করা এবং প্রার্থী ও তার কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে সহিংসতা বা কলহে লিপ্ত না হওয়ার জন্য সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ ৩৯টি দল অংশ নিয়েছিল। ওই নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট পড়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ১২টি দল অংশ নেয়। বিএনপিসহ বেশির ভাগ দল তা বর্জন করে। নির্বাচন কমিশন সূত্র মতে, ১৯৯৬-এ সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৭৪.৯৬ শতাংশ ভোট পড়েছিল, ওই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল। ২০০১ সালে অষ্টম সংসদীয় নির্বাচনে ৭৫.৫৯% এবং ২০০৮ সালে নবম সংসদীয় নির্বাচনে ৮৭.১৩% ভোট পড়েছিল। এবার ভোট পড়েছে ৪১.৮%, যা এযাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন।
৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে এবার ভোট হয় ২৯৯টি আসনে। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নওগাঁ-২ আসনে ভোট গ্রহণ স্থগিত রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৮টি দল অংশ নেয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত, তাহলে নির্বাচনের সৌন্দর্যটি আরও বৃদ্ধি পেত। কারণ দেশব্যাপী যারা বিএনপির সমর্থক আছেন, তারাও ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে সেই সৌন্দর্যটি নষ্ট করে ফেলেছে।’
সাউথ এশিয়া ডেমোক্র্যাটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক পাওলো কাসাকা বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। তবে প্রধান বিরোধী দল এলে নির্বাচন আরও অংশগ্রহণমূলক হতো। স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ও ভোটপদ্ধতির প্রশংসা করেন তিনি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং কয়েকটি দেশের পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। আমন্ত্রিত এসব বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচনের পরিবেশের প্রশংসা করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, সরকারের সহায়তায় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। এদিকে সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা থেকে সরছে না বিএনপি। আন্দোলন কর্মসূচিতে রয়েছে তারা। দলটি বলছে, ‘তামাশার’ এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকামী মানুষের বিজয় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত, পাকিস্তান, চীন, ভুটান, রাশিয়া, ফিলিপাইন, নেপাল, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল, মরক্কো ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত অভিনন্দন জানিয়েছেন।
নির্বাচন সম্পন্ন হলো। এখন সরকার শপথ গ্রহণ করবে। সরকার আগামীর বাংলাদেশ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য কী কী কৌশল বা পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, গত সময়ের ভুলগুলো কীভাবে শুধরে সামনের দিকে এগোবে, সেটাই দেখার বিষয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন খুবই প্রয়োজন ছিল। কারণ বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস খুব একটা মসৃণ ছিল না। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে হলেও বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারত, কিন্তু তা তারা করেনি। দেশের কল্যাণে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার জন্য নির্বাচন অপরিহার্য ছিল, সরকার তা করতে পেরেছে। আগামীতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়েই দেশ পরিচালনায় অগ্রসর হতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই এ পথ পাড়ি দিতে হবে, এটাই প্রত্যাশা সবার।