১০ জানুয়ারি বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭২ সালের এই দিনে বাঙালির যাত্রা শুরু হয়েছিল অন্ধকার থেকে আলোর পথে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছিল বিজয়ের স্বাধীনতা। দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। বিজয়ীর বেশে এক মহানায়কের ঘরে ফেরা বিশ্ববাসী সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের মহানায়ক, জাতির পিতা এবং জনগণের বন্ধু। দেশকে তিনি এক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যুদ্ধ শুরুর পরপরই ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পাকিস্তান জেলে অন্তরিন রাখা হয়। এর আগেই বঙ্গবন্ধু জনগণের উদ্দেশে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভারত সরকার তার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়। বাঙালি মুক্তিকামী মানুষ ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেলে বসেও দেশের মানুষের জন্য মঙ্গল কামনা করেন। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে জেলে বসেও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছিলেন। তার মুক্তির দাবিতে বাংলাদেশকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি আবর্তিত হয়েছিল। ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেলে বন্দি থাকলেও অস্থায়ী সরকার তার নামেই ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে।
মুজিবনগর সরকারের সফল নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার পর বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বেও তার মুক্তির দাবি উঠতে থাকে। ২১ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের ঘোষণা প্রকাশ করে। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি করাচিতে অনুষ্ঠিত পাক সরকারের এক নীতিনির্ধারণী বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আন্তর্জাতিক চাপে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অবশেষে পাক শাসকগোষ্ঠী ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি করাচি বিমানবন্দরে একটি চার্টার্ড বিমানে বঙ্গবন্ধুকে ইংল্যান্ডে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। বিমানবন্দর ত্যাগ করার পরই শেখ মুজিবকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে- এ খবর পাকিস্তান রেডিও থেকে ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিষয়টি বিবিসির সকালের খবরে প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। রেডিওতে আরও জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডি বিমানবন্দরে শেখ মুজিবকে বিদায় সংবর্ধনা জানিয়েছেন। বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনের বিখ্যাত ক্লারিজেস হোটেলে নিয়ে যান। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও সহায়তা প্রদানের জন্য তিনি ব্রিটিশ সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
৯ জানুয়ারি হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কমেট বিমান রওনা হয় বাংলাদেশের উদ্দেশে। ভারতের নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধু যাত্রাবিরতি করেন ১০ জানুয়ারি। দিল্লির বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। ১০ জানুয়ারি দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। তিনি যখন বিমান থেকে দেশকে দেখতে পাচ্ছিলেন, তখন অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেছিলেন। প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ-বাতাস। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে তিনি এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে পান। বিমানবন্দর এলাকা হয়ে উঠেছিল জনসমুদ্র।
ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে আক্ষেপ করেছিলেন ‘আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা না করে সবচেয়ে বড় ভুল করেছি।’ আসলে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ছিল নানা রকম স্বার্থের হিসাব-নিকাশ। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতকারী বাঙালির ষড়যন্ত্রের নির্মম পরিহাসে বঙ্গবন্ধুর জীবনের চরম ক্ষয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল এ দেশের বাঙালি। বীরের বেশে যে দেশে তিনি পা রাখলেন, সে দেশেই তাকে মৃত্যুর গ্লানি ভোগ করতে হলো। এ ধরনের ক্ষণজন্মা পৃথিবীতে বারবার আসে না। দেশের জন্য দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি কাজ করেছেন। একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি সার্বভৌম দেশ উপহার দিয়েছেন। এ জাতি কখনো তাকে ভুলবে না।