দারিদ্র্যের কারণে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় অনেক মানুষ ভুগছেন। খাদ্যের বাড়তি দাম বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ পরিবারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাবে মানুষ খাবারের পরিমাণ ও গুণগত মান কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদন হ্রাস পেলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ার কারণে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়ছে। জাতীয় উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় দারিদ্র্য দূরীকরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তা কেন ঝুঁকিতে থাকবে? কারণ দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত।
বিশ্ব একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। করোনা মহামারির ধাক্কা, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ এই বিশ্বকে করেছে নাস্তানাবুদ। বৈশ্বিক মন্দা ও দুর্যোগ মোকাবিলা করে দেশ আজ ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়। এরই মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর জরিপে উঠে এসেছে এক তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
শহরের চেয়ে গ্রামে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হার বেশি। গ্রামে ২৪ দশমিক ১২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আর শহর এলাকায় এ হার ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ মানুষও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ১০০ জনে ২১ দশমিক ৯১ জন মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। এর মধ্যে রংপুরে সবচেয়ে বেশি। এই জেলায় প্রতি ১০০ জনে ২৯ দশমিক ৯৮ জন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সবচেয়ে কম ঢাকা বিভাগে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া বরিশালে ২২ দশমিক ৮৩, চট্টগ্রামে ১৯ দশমিক ৬৬, ময়মনসিংহে ২৬, রাজশাহীতে ২৫ দশমিক শূন্য ১ ও সিলেটে ২৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অন্যদিকে দেশে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হার শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন সিলেট বিভাগে ১০০ জনে ১ দশমিক ৪২ জন। আর কম হচ্ছে রাজশাহীতে দশমিক ৫১ শতাংশ। সূত্রমতে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে আটটি প্রশ্নের মাধ্যমে এই জরিপ করা হয়। ২৯ হাজার ৭৬০টি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই জরিপ করা হয়।
স্বল্প আয়ের মানুষ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেকেই সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যদিও সরকার নিম্ন আয়ের ১ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের ভর্তুকি মূল্যে তেল, চিনি, ডাল দেয় মাসে একবার। খোলাবাজারেও বিক্রি করে কিছু পণ্য। নিম্ন আয়ের মানুষের সংসারের ব্যয় বেড়েছে, আয় বাড়েনি। যে কারণে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা এখন কাটছাঁট করতে গিয়ে অপুষ্টি ও অনাহারে ভুগছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার বেশি বেড়ে গেলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী গরিব হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে যায়। দেশের নিম্ন আয়ের ৭০ শতাংশ পরিবার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
জাতীয় পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা কেবল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না, আমদানি এবং রপ্তানির ওপরও নির্ভর করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৩ সালে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছিলেন দেশের মানুষকে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ যাতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে না পতিত হয়, সে জন্য তিনি সবাইকে প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। বাংলাদেশের কয়েক প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির আশঙ্কা স্বাধীনতা লাভের ৫২ বছর পরও ভাবতে হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যের অপচয় রোধ ও খাদ্যের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারলেই খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা কমিয়ে আনা সম্ভব।