আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণে সরকার সার ও বিদ্যুৎ খাতের দেনা মেটাতে বাজারে ‘বিশেষ বন্ড’ ছাড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি অবশ্যই ভালো খবর। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সার ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের দেনা প্রায় ২৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পর্যায়ক্রমে বন্ড ইস্যু করে এ টাকা পরিশোধ করা হবে। তবে প্রথম দফায় বন্ড ছাড়া হবে সারের পাওনা পরিশোধ বাবদ। আর অচিরেই বিদ্যুতের ছেড়ে দেওয়া হবে। অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে মন্দের ভালো হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বন্ড হলো একধরনের আর্থিক পণ্য, যা বিক্রি করে সরকারি ও বেসরকারি খাত দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নিতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, চলতি বাজেটের আওতায় এসব বন্ড ইস্যু করা হবে। সুতরাং বাজেটে সরকারের ঋণে এই বিশেষ বন্ডের সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকাও যুক্ত হবে। একই সঙ্গে সরকারের ভর্তুকি বাবদ ব্যয়েও যুক্ত হবে। তাই চলতি বাজেটে ব্যয় সংকোচন নীতি নেওয়ায় ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যেই থাকার আশা রয়েছে।
আমদানিকারক ও উৎপাদকের কাছ থেকে যে দামে সার কেনা হয়, তার চেয়ে অনেক কম দামে বেচা হয় বাজারে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও তাই। মাঝখানের পার্থক্যটুকু ভর্তুকি দেয় সরকার। কিন্তু গত অর্থবছরে ভর্তুকি চাহিদা অনেক বেড়ে যাওয়া এবং তার আগের অর্থবছরের বকেয়া থাকায় সার ও বিদ্যুৎ খাতের এ পাওনা পরিশোধ করতে পারেনি সরকার। এতে সার আমদানিকারক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বকেয়া টাকা না পেয়ে বিপদে পড়ে। রাজস্ব আহরণ কম হওয়ায় সরকার আর্থিক সংকটে পড়ে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভর্তুকির ওই টাকা নগদ পরিশোধ করতে গেলে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়বে। এ জন্য আপাতত আর্থিক চাপ প্রশমনে বন্ড ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণে বিদ্যুৎসহ অন্য খাতে ভর্তুকির চাহিদা বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সরকারের ঋণের দায়ও বেড়েছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ছে না। এ কারণে সরকারের কোষাগারে নগদ টাকার ঘাটতি দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া শুরু করেছিল। তাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সে পথ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরে এসেছে। এখন সরকার হাঁটছে বন্ড ছাড়ার পথে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ভর্তুকির টাকা পাবেন তাদের নগদ দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু নগদ দিতে গেলে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যাবে। তাই বিকল্প হিসেবে বন্ড ইস্যু করে তা পরিশোধ করা হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর খবরের কাগজকে বলেন, ‘বন্ড ইস্যু করে দেনা শোধ করার ফলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়বে না। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ প্রশমিত হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত মন্দের ভালো।’
সরকারের আর্থিক চাপ প্রশমনে বন্ড ইস্যুর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। এতে উদ্যোক্তারা খেলাপি হওয়া থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নতুন করে এলসি খোলায় আর কোনো সমস্যা থাকবে না। একই সঙ্গে ব্যাংক সেই বন্ডের বিপরীতে নির্দিষ্ট রেপো হারে সুদ পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকে নিজেদের সিআরআর-এসএলআর সংরক্ষণ করতে পারবে। এসএলআর সংরক্ষণের জন্য সরকারি সিকিউরিটিকে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হতো, বিশেষ বন্ডের ক্ষেত্রে সেখান থেকে বন্ডের সমপরিমাণ অর্থ বাদ যাবে। ফলে এ অর্থ তখন ব্যাংক অন্য খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে।