পাসপোর্ট হলো বিদেশ যাওয়ার বৈধ পরিচয়পত্র। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ যেখানে নাগরিকদের জন্য ই-পাসপোর্ট চালু করা হয়। পাসপোর্টে বয়স জালিয়াতিসহ নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয় বাংলাদেশের নাগরিকদের। বাংলাদেশের প্রতিটি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সক্রিয় রয়েছে একাধিক দালাল চক্র। ই-পাসপোর্ট হওয়ার পরও বয়স ও নাম-পরিচয়ের জালিয়াতি থেমে নেই। ভুক্তভোগী, সংশ্লিষ্ট অফিসে কর্মরত ব্যক্তি ও গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে পাসপোর্টে বয়স জালিয়াতির বিষয়ে ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে অনুসন্ধান চালায় খবরের কাগজ টিম। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে বয়স জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র।
ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে আসা সিটি ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম রিপন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দালালদের জন্য পাসপোর্ট অফিসে ঢোকা দায়, গেটে ঢুকতেই তারা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। কী পাসপোর্ট, বয়স কমাবেন নাকি নাম-পরিচয় সংশোধন করবেন। এসব বলতে বলতে অস্থির করে তোলে দালালরা। এদের কাছে পাসপোর্টের সব সমস্যার সমাধান আছে। তাদের কাছে সবই হালাল।’
জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি পাঁচ বছর মেয়াদি বিওয়াই ০৬৭০১৭০ নম্বরের একটি পাসপোর্ট করা হয়। ভোটার আইডি অনুযায়ী সেই পাসপোর্ট করা হয়েছে, যেখানে পাসপোর্টধারীর জন্মসাল দেখানো হয়েছে ৩০ মার্চ ১৯৯৪। সে অনুযায়ী তার বয়স প্রায় ৩০ বছর। পাসপোর্টধারী সেই ব্যক্তির নাম বরণ চৌধুরী। এটি তার প্রথম পাসপোর্ট বলে তিনি দাবি করেছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তার বয়সের ব্যাপক জালিয়াতি। তিনি ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ২০০১ সালে তিনি আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেন। সে অনুযায়ী তার জন্মসাল হওয়ার কথা ১৯৮৪। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি এটা তার জীবনের প্রথম পাসপোর্ট হয়ে থাকে, তাহলে তিনি লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে কীভাবে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লন্ডনে বড় ধরনের অপরাধ করায় তাকে সে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময় দেশে এসে তিনি ভোটার আইডি (আগে ভোটার আইডি ছিল না) ও পাসপোর্ট করেন। তিনি বিওয়াই ০৬৭০১৭০ নম্বরের পাসপোর্ট দিয়ে দুবাইয়ে গিয়ে পলাতক আছেন।
আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন খবরের কাগজকে বলেন, ভোটার আইডির তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পাসপোর্ট করা হয়। পাসপোর্টে বয়স পরিবর্তন হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই বৈধ কাগজপত্র লাগবে। বয়স কত বছর পরিবর্তন করা যাবে তা নির্দিষ্ট না থাকলেও যদি কেউ বয়স ১০ বছর কমিয়ে থাকে তা হবে অসামঞ্জস্য।
পাসপোর্ট জালিয়াতির জন্য পুলিশ ও আনসার এক হয়ে কাজ করারও অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করে আদালতে সোপর্দ করলেও তারা আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে জামিনে বেরিয়ে আবারও দালালি শুরু করে।
সাধারণ মানুষ যাতে দালালের সহযোগিতা ছাড়াই পাসপোর্ট করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। সেক্ষেত্রে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের পরিচয় দিতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ও নির্ধারিত সময়ে তাদের পাসপোর্ট হাতে পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সামান্য ভুলের জন্য কাগজপত্র ছুড়ে ফেলেন অথবা ভুল শুধরে না দিয়ে তা ফেরত দেন। তখন গত্যন্তর না পেয়ে অনেকেই দালালের শরণাপন্ন হন। আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা, যারা বিদেশ-বিভুঁইয়ে রক্ত-ঘামের বিনিময়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন, তাদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত। তাদের ভুলগুলো সংশোধন করে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়াই প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে জনগণের করের পয়সায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন গুনতে হয়। সুতরাং সাধারণ মানুষ যাতে দালালের খপ্পরে পড়ে বিড়ম্বনার শিকার না হয় সেদিকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।
পাসপোর্ট অফিসের ভয়াবহ জালিয়াতি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বর্ণনাতীত। প্রশাসনকে এ ধরনের জালিয়াতি ও ভোগান্তিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। বৈধভাবে পাসপোর্ট পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। এ অধিকার রক্ষায় পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে কঠোর হতে হবে। দালাল কিংবা সরকারি কর্মচারী- যারাই জালিয়াতির আশ্রয় নেবে আইনের আওতায় এনে তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।