বাংলাদেশে চাকরি করে বেতন-ভাতা নিয়ে যাওয়া বিদেশির সংখ্যা দুই থেকে আড়াই লাখ বলে গবেষণা সংস্থার অনুমান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখের মতো। করোনা মহামারির আগের বছর ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা ছিল ৮৫ হাজার ৪৮৬। গত ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কোম্পানির সব ধরনের বৈদেশিক লেনদেন সম্পর্কে রিপোর্ট করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশে বলা হয়, বিদেশে কোনো দায় পরিশোধ, আয় বা অন্য কোনো রেমিট্যান্স গ্রহণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী যোগ্যতর কর্তৃপক্ষের পুর্বানুমতি নিতে হবে।
এ দেশে কর্মরত বিদেশিদের সিংহভাগই স্বল্প সময়ের ভিসা নিয়ে কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন ও ঘন ঘন যাতায়াত করে থাকেন। পোশাকশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, ভারী শিল্পকারখানা, সেবা খাত ও অবকাঠামো নির্মাণে নিযুক্ত দক্ষ এসব বিদেশি নাগরিক এ দেশে মালিকপক্ষের সহায়তায় নিয়মিত উচ্চ বেতনে চাকরি করে তাদের আয় নিজ নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের আয়ের একটা বিরাট অংশ মালিকপক্ষ বিদেশেই কোম্পানি বা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব থেকে পরিশোধ করে থাকে। ফলে এ ধরনের আয়ে প্রাপ্য কর থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বছরের পর বছর। এ ছাড়া হুন্ডিতে যাচ্ছে তাদের বেতন-ভাতার টাকা। বিদেশি কর্মী ও তাদের মালিকপক্ষের এ ধরনের বোঝাপড়ায় করবহির্ভূত অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
কর আইন অনুযায়ী এসব বিদেশি কর্মী ছয় মাস (১৮৩ দিন) সময়ের জন্য চাকরি নিয়ে এ দেশে এলে তাদের নিজ আয়ের ৩০ শতাংশ আয়কর দেওয়ার বিধান রয়েছে। যারা নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে ওই সময়ের বেশি সময় ধরে এ দেশে থেকে চাকরি করছেন, তাদের করহার বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকের মতো, বার্ষিক আয়ের ধাপ অনুযায়ী হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্তৃক ওয়ার্ক পারমিট বা কর্মানুমতি দেওয়া আছে ১৬ হাজার ৫৭৯ জন বিদেশিকে। অথচ এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, আয়কর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন এর দ্বিগুণ বা প্রায় ৩২ হাজারের মতো। অপরদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারিতে দেশে অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা মোট ২৭ হাজার ৮৪২ জন বলে উল্লেখ করেছে। এ ধরনের সমন্বয়হীনতা সত্যিই দেশের জন্য উদ্বেগজনক।
চাকরি সূত্রে বাংলাদেশে আসা বিদেশি নাগরিকদের সিংহভাগের বেতন-ভাতা পরিশোধ হচ্ছে করবহির্ভূত প্রক্রিয়ায়। এ প্রক্রিয়ায় বিদেশি কর্মীর পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে কোম্পানির বৈদেশিক ব্যাংক আয়ের হিসাব, বিদেশে কোম্পানির মালিকপক্ষ বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ও হুন্ডির মাধ্যমে। এ ধরনের অর্থ স্থানান্তর আইনসিদ্ধ নয়। তাই একটি বড় অঙ্কের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশ থেকে। তথ্য থেকে জানা যায়, এ দেশে কাজ করতে আসা বিদেশিদের ব্যাপারে সরকারের কোনো এজেন্সিই সঠিক খোঁজখবর বা হিসাব রাখে না। বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যেও মিল নেই। তাই সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভবও হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বার্ষিক তথ্য থেকে জানা যায়, বহির্গামী প্রাইভেট রেমিট্যান্সের এই পরিমাণ ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৮০-৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভারতেই যায় ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থ দেশ থেকে চলে গেলেও যথাযথ তথ্য না পাওয়ার ফলে কর আদায়ের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে না সরকার। বাণিজ্যের আড়ালে দেশ থেকে মুদ্রা পাচার কমেছে। তবে ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় মুদ্রা পাচার অব্যাহত আছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিডা ও এনবিআরের তথ্যে এই ধরনের বড় পার্থক্য দেশে কাজ করতে আসা বিদেশিদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।’
করবহির্ভূত ‘ফ্লাই আউট’ ঠেকাতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালন করতে পারে। আন্তবিভাগীয় তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এমনিতেই সারা বছরের ব্যয়ের অর্থ সংকটে থাকে, কারণ আয় পর্যাপ্ত নয়। বিদেশি নাগরিক দেশে চাকরি করতে এলে তাদের বৈধ অবস্থান নিশ্চিত করে উপার্জিত আয় থেকে যদি কর পাওয়া যায়, সেটা অবহেলা করা উচিত নয়। বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে চলে যাওয়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এক কথায় কর আদায়ের ক্ষমতা প্রয়োগে সরকারকেই যথার্থ ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলে করবহির্ভূত অর্থ পাচার রোধ করা সম্ভব হবে।