ব্যাংকের শাখাগুলোয় নগদ ডলারের সংকট চলছেই। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত ভ্রমণ, জরুরি চিকিৎসা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো সন্তানের টিউশন ফি, থাকা-খাওয়া এবং হাতখরচের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার ব্যাংকে পাওয়া যাচ্ছে না। দুই বছর ধরে চলমান এই ডলারসংকট আর নেই বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করলেও বাস্তবতার সঙ্গে ওই দাবির মিল পাওয়া যায় না। আমদানির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন, জরুরি কাঁচামাল ও নিত্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংক ডলার দিতে পারছে না। কোনো কোনো ব্যাংক আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের দাম নিচ্ছে বেশি। আমদানিতে ডলারের দাম ১১৪ থেকে ১২১ টাকা পর্যন্ত ওঠে গত বছরের অক্টোবরে।
ডলারের সংকটজনক পরিস্থিতিকে পুঁজি করে একশ্রেণির মুনাফালোভী ব্যক্তি তাদের আয় করা বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষ করে ডলার নিজেদের হাতে রাখছেন। সময় বুঝে তারা দালাল চক্রের কাছে তা বেশি দরে বিক্রিও করছেন। আবার দালাল চক্র ও প্রবাসীদের কাছ থেকে নানা কৌশলে নগদ ডলার সংগ্রহ করে তা দিয়ে ব্যবসা করছেন। ব্যাংকাররা মনে করেন, এ জন্য নগদ ডলারের দর কমছে না। হাতে হাতে এসব ডলার লেনদেন হওয়ার কারণে বিনিময় হারে একটি অস্থিরতা চলছেই।
খবরের কাগজের নিজস্ব অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ব্যাংকের শাখাগুলোর বাইরে হাতে হাতে নগদ ডলার বিক্রি চক্রের সক্রিয় তৎপরতা। তারা উচ্চ দরে ডলার কেনে ও বিক্রি করে। বিক্রিতে প্রতি ডলার দাম নেয় ১২৫ টাকা।
এ ছাড়া ব্যাংকগুলোয় ডলার না পাওয়ার চিত্রও উঠে এসেছে। ব্যাংকাররা জানান, ডলার কিনতে ব্যয় হয় ১১৫ টাকা ৫০ পয়সা। এত দামে ডলার কিনে এবিবি ও বাফেদা কর্তৃক নির্ধারিত ১১০ টাকা দরে বিক্রি সম্ভব নয় বলেও জানান তারা। অবস্থাদৃষ্টে স্পষ্ট হয়েছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ত্রুটি। ব্যাংক তো ব্যবসা করে। অর্থ বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জনই ব্যাংকের কাজ। ওই মুনাফা থেকেই ব্যাংক তার পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করে এবং আমানতকারীকে লাভ দেয়।
বেশি দামে ডলার কিনে কম দামে বিক্রি করার নীতি বাস্তবসম্মত কি না ভেবে দেখা দরকার। এ জন্যই অর্থনীতিবিদরা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরামর্শ দিয়ে আসছেন ডলারের দর বাজারমুখী করতে।
এতে বিদ্যমান বিনিময় হারের অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। এ ধারণা বাস্তবতার সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ ডলারের দর নির্ধারণে এবিবি ও বাফেদার জড়িত হওয়াটাকে তৃতীয় পক্ষের ওকালতি হিসেবেও নিন্দা করেছেন। তারা বলেছেন, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি-ব্যর্থতা। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পরামর্শ দিয়েছে ডলারের দর বাজারভিত্তিক করতে। তারপরও নিয়ন্ত্রণমূলক বিনিময় হার অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
এমতাবস্থায় অর্থনীতিতে চলমান সংকট উত্তরণে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টার মাধ্যমে বাজারে ডলার সরবরাহের বিকল্প নেই। কেউ কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন বৈদেশিক ঋণের অর্থে ও বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের গতি বাড়াতে হবে, যাতে বেশি করে প্রতিশ্রুত বৈদেশিক ঋণের ছাড় বা অবমুক্ত হয়। এতে করেও ডলারের সরবরাহ বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি ক্ষয় হতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ভালো রাখা সম্ভব হবে।
জানুয়ারি-জুন মেয়াদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে। অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কী পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক, সেদিকে তাকিয়ে আছেন দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও অর্থনীতিবিদরা।