বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত ১৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত জরিপের প্রতিবেদনে ২১টি মেথডে দেশের মানুষের চিকিৎসার চিত্র তুলে ধরে। অর্থাৎ বিবিএসের সর্বশেষ জরিপের ফলাফল অনুসারে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীর ঠাসাঠাসি থাকলেও এখনো দেশের মানুষ সর্বোচ্চ হারে (৫৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ) চিকিৎসা নিয়ে থাকেন ফার্মেসি থেকে। এর পরেই নন-কোয়ালিফাইড চিকিৎসকদের (হাতুড়ে) কাছ থেকে চিকিৎসা নেন ১৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে ৬৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ মানুষই চিকিৎসা নিচ্ছেন অস্বীকৃত মাধ্যম থেকে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার দিক থেকে রোগী ও রোগের বিস্তারও বেশি। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রতিদিনই থাকে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। চিকিৎসকদের প্রাইভেট চেম্বারেও এখন সিরিয়াল পাওয়া যেন সোনার হরিণের মতোই কঠিন হয়ে উঠেছে। ওষুধ কেনার জন্য ভিড় লেগে থাকে দোকানেও। বস্তি এলাকাগুলোয় ফার্মেসির লোকজনই অনেক সময় রোগের লক্ষণ শুনে নিজেরাই ডাক্তারি শুরু করে দেন। তাদের এ বিষয়ে কোনো ডিপ্লোমারও দরকার হয় না। তাদের দেওয়া ওষুধ নিয়েই রোগীরা ঘরে ফেরেন। আমরা এখনো এ দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গুণগত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারিনি। অথচ আমরা চারদিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে বলছি চিকিৎসা খাতে উন্নতি আর আধুনিকতার লম্বা গল্পের জোয়ার।
যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, যারা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত এবং যাদের আর্থসামাজিক অবস্থা নিম্নে, তারাই বেশি ফার্মেসি বা কোয়াকের শরণাপন্ন হন। সচেতন, শিক্ষিত ও আর্থিক সচ্ছল পর্যায়ের মানুষ স্বীকৃত ডাক্তারকেই বেছে নেবেন। নিম্ন আয়ের কিংবা কম সুবিধাপ্রাপ্ত এলাকার মানুষের কাছে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে আরও কাজ করতে হবে। কারণ কম আয়ের মানুষ ডাক্তারের ফি, হাসপাতালের সার্ভিস চার্জ, হাসপাতালে যাতায়াত এড়াতে ঘরের কাছে যে চিকিৎসা সহজে পান সেটাই লুফে নেন।
বিবিএস যে তথ্য দিয়েছে তা সত্যিই চমকে ওঠার মতো। এটাই বাস্তবতা। এখানে বলা হচ্ছে, কোন মাধ্যম থেকে কত শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন। ফার্মেসি থেকে ৫৩.৫৪, অন্যান্য মাধ্যমে ১৬.২৬, ১৩.০৪ অস্বীকৃত চিকিৎসক, ৯.১৩ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক, ১.৭০ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল, ২.১৩ সরকারি জেলা/সদর হাসপাতাল, ২.৯৪ সরকারি উপজেলা হাসপাতাল, ১.২৬ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ/বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে। ফার্মেসি ও হাতুড়ের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন ৬৭% মানুষ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন দায়িত্ব গ্রহণের দিনেই তার কাজের অগ্রাধিকার কী থাকবে- এমন প্রশ্নের মুখে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার প্রথম লক্ষ্য থাকবে চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ যাতে সহজে ভালো মানের চিকিৎসা পান, সেদিকে বেশি নজর থাকবে। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রীও সব সময় সেদিকে গুরুত্ব দেন।’
মানুষ সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রিকের মতো অসুখের জন্য সবার আগে ঘরের কাছে ফার্মেসিতে গিয়ে নির্দিষ্ট রোগের কথা জানিয়ে ওষুধ চান। এতে মানুষ তাৎক্ষণিক উপকৃত হলেও বিপদও আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে চিকিৎসার এসব প্রাথমিক উৎসকে নানাভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা। তাতে আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং মানুষ আরও নিরাপদ থাকবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. আ ব ম ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার জন্য অনেক উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। মানুষ নিরুপায় না হলে সহসা হাসপাতালে যেতে চায় না। অনেকেই হাসপাতাল ও ডাক্তারখানাকে ঝামেলা মনে করেন। মানুষের মন থেকে এই ভয় দূর করতে হবে।
সাধারণ মানুষ যাতে নিরাপদ চিকিৎসাসেবা পান, সে জন্য কাজ করতে হবে। নিবন্ধনের বাইরে থাকা ফার্মেসিগুলোর কীভাবে গুণগত মান বাড়ানো যায়, সে জন্য কর্তৃপক্ষকে আরও সচেষ্ট হতে হবে। মডেল ফার্মেসির পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। ফার্মেসিগুলোকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। গুণগত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে মানুষ নিরাপদ থাকবেন।