পদ্মা নদীতে ১৭ জানুয়ারি পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটের ফেরি রজনীগন্ধা ডুবে যাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে নৌ-কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ফেরির জীবনকালের সক্ষমতার বিষয়টিও এখন সামনে চলে এসেছে। ত্রুটি ছিল কি না, ফেরির বয়স কত, ডুবোচরে আটকে পড়েছিল কি না, বালুবাহী নৌকা বাল্ক হেডে আঘাত পেয়েছে কি না, ঘন কুয়াশা ও বৈরী আবহাওয়া, পানির নিচে প্রচণ্ড স্রোত- এগুলো আলোচনায় থাকে সরগরম। তবে যে ফেরিটি সম্প্রতি ডুবেছে তার বয়স ৯ বছর হবে। এর আগে যখনই ফেরি নিয়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটে বা ভরা বর্ষা মৌসুমে স্রোতের বিপরীতে পাল্লা দিয়ে চলতে না পারে, তখনই এই সক্ষমতার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে কয়েক দফা একাধিক ফেরি সেতুর পিলারের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই ধাক্কা দেয় রো রো ফেরি ‘শাহজালাল’। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) বহরে থাকা এই ফেরিটির বয়স এখন ৪৩ বছর। বিআইডব্লিউটিসির ফেরি বিভাগে এটিকেই সবচেয়ে বুড়ো ফেরি হিসেবে চেনেন সবাই। এর সঙ্গী হিসেবে আরও আটটি ফেরি রয়েছে। ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে জলযানগুলো অত্যন্ত নাজুক ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক জলযান আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে পুরোনো কয়েকটি স্টিমার ও ফেরির অবস্থা খুবই করুণ। তবে জলযানের সংখ্যা কম, মানসম্মত ও আধুনিক না হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ নৌপরিবহন সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি ২৮ নম্বর অধ্যাদেশ বলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন এবং ৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১০টি প্রতিষ্ঠানের স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি ও নৌযান একীভূত করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে বিআইডব্লিউটিসির মোট জলযানের সংখ্যা ছিল ৬০৮টি। এর সবই ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। ফলে ৬০৮টি জলযান বহরে থাকলেও বিআইডব্লিউটিসি সব জলযান সার্ভিস পরিচালনায় নিয়োজিত করতে পারেনি।
বিআইডব্লিউটিসির একাধিক সূত্র জানায়, ফেরিগুলো মেরামতে তাদের নিজস্ব চারটি ডকইয়ার্ড ছাড়াও বেশকিছু বেসরকারি শিপইয়ার্ড-ডকইয়ার্ডের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক কাজ হয়। যেখানে বিআইডব্লিউটিসি দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নৌযান মেরামত করা হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রকৌশলীরা জানান, প্রতিটি ফেরি-নৌযান প্রতি তিন বছর পর ডকিংসহ মেরামত করতে হয়। কিন্তু বাজেট স্বল্পতার কারণে বিআইডব্লিউটিসির পক্ষে এই ডকিং কাজ নিয়মিত হয় না। ফলে তিন বছরের বেশি সময় ডকিং ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছে নাজুক অবস্থায় থাকা ফেরিসহ আরও কিছু নৌযান।
পুরোনো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেরিগুলো স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে। মেরামত করেও অনেক ক্ষেত্রে ঠিক রাখা যায় না। ফলে সব সময়ই কোনো না কোনো ফেরি কারখানায় পড়ে থাকে মেরামতের জন্য। কর্তৃপক্ষ বলছে, ৩০ বছরের বেশি বয়সী ফেরিগুলো আর ব্যবহার হবে না। এগুলো স্থায়ীভাবে ডকে নিয়ে আসা হচ্ছে। বিধি অনুসারে পর্যায়ক্রমে এগুলো স্ক্র্যাপ আকারে বিক্রি করা হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাধারণত ২০-২৫ বছরের বেশি এসব ফেরির জীবনকাল থাকে না। যদিও পরে ভালোভাবে মেরামত বা সংরক্ষণ করলে হয়তো আরও কিছুদিন ব্যবহার করা যেতে পারে। ফেরি আর নৌযানের মধ্যে পার্থক্য আছে। দেশের ফেরিঘাট ও বাইরের দেশের ফেরিঘাটের মধ্যেও পার্থক্য আছে। আমাদের দেশের ফেরিগুলোর প্রতি ট্রিপে থামার সময় ঘাটের সঙ্গে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে। এতে অবশ্যই ফেরির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
ফেরির অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বিষয়টি অনেক সময় আলোচনায় আসে। কর্তৃপক্ষকে ফেরি সার্ভিসের নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। টেকসই ফেরি সার্ভিসের অভাবে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। সার্বিক পরিস্থিতি গুরুত্ব দিয়ে এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় সে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে। মেয়াদ উত্তীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। মানুষের নৌ ও জলযান ভ্রমণ নিরাপদ থাকুক, সেই প্রত্যাশা সবার।