ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কার্ড সেবা-সম্পর্কিত বিস্তর অভিযোগ থাকলেও এর অধিকাংশই অনিষ্পন্ন রয়ে যাচ্ছে। এতে গ্রাহক হয়রানি বেড়েই চলছে, পাশাপাশি আর্থিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ঠিক কী পরিমাণ অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় এবং গ্রাহক তার সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান পান কি না, তা জানা সম্ভব হয় না। ব্যাংকগুলো এসব তথ্য গণমাধ্যমকে দেয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ তথ্য এখন আর প্রকাশ করে না। দেশে বর্তমানে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ড মিলিয়ে মোট ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যা ৪ কোটি ১৭ লাখের মতো। কার্ডে লেনদেনের ফি বেশি নেওয়া, এটিএম বুথে কার্ড আটকে যাওয়া এবং এর ফলে জরুরি প্রয়োজনের সময় নগদ টাকা উত্তোলনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে উল্টো দুর্ভোগে পড়া, দেশের বাইরে ডুয়েল কারেন্সি কার্ডে ডলার বা অন্য মুদ্রা বুথ থেকে নগদ উত্তোলনে বাড়তি চার্জ আদায়, অপ্রয়োজনে কার্ড নষ্ট করে রি-ইস্যুর নামে বাড়তি ফি আদায় ও সময় ক্ষেপণ করা, বছর শেষে কার্ডের লেনদেন সংখ্যা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী সম্পন্ন করার পরও বার্ষিক ফি মওকুফ না করার মতো অভিযোগগুলো বেশি হয়ে থাকে।
দেশের বাইরে ভ্রমণ বা পড়ালেখা, ট্রেনিং এবং কেনাকাটায় কার্ড ব্যবহারকারীর জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শহরে ও শহরের বাইরে বুথ সুবিধা সহজলভ্য থাকায় কার্ডের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনা। দেশে এখন এটিএম বুথের সংখ্যা শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের বুথ থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের সুবিধাও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায়, গত নভেম্বরের শেষে দেশে মোট এটিএম বুথের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪৩৭টি। এর মধ্যে শহর এলাকায় ৯ হাজার ৪৫৮টি এবং গ্রামাঞ্চলে ৩ হাজার ৯৭৯টি।
প্রতি মাসে এটিএম বুথে কার্ড আটকে যাওয়া, মর্ডার অ্যাফসেস না থাকায় টাকা তুলতে না পারা ও বুথে প্রয়োজনীয় টাকা না থাকাসহ বিস্তর অভিযোগ থাকে গ্রাহকের। এ অভিযোগের সংখ্যা প্রত্যেক এটিএম বুথেই মাসে কমপক্ষে ১০টি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার এটিএম বুথ রয়েছে। মাসে গড়ে এসব বুথের প্রতিটিতে ৩০টি অভিযোগ জমা হলে মাস শেষে মোট অভিযোগের সংখ্যা হয় ৪ লাখ ৫ হাজার। বছরে অভিযোগের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮ লাখ ৬০ হাজার। প্রতি বুথে মাসে অভিযোগের সংখ্যা ১৫টি হলে অভিযোগের সংখ্যা বছরে অর্ধেক কমে হয় ২৪ লাখ ৩০ হাজার। আরও কমে বুথপ্রতি মাসে অভিযোগের সংখ্যা একটি হলেও ১২ মাস তথা এক বছরে মোট অভিযোগের সংখ্যা হয় ১ লাখ ৬২ হাজার। বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডি তথ্য থেকে জানা যায়, বছরে মাত্র ৮৫০টি অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে।
কার্ড সেবা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ প্রাথমিকভাবে বুথ থেকেই গ্রাহকের মাধ্যমে হটলাইনে কল দিয়ে রেকর্ড হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কার্ড সেবা বিভাগে এবং এরপর শাখায়। অভিযোগের একটি বড় অংশ সময়ক্ষেপণ ও দুর্ভোগ পোহানোর মাধ্যমে শেষ হয়। গ্রাহক আর এগোয় না। অভিযোগ গুরুতর হলে একটি সামান্য অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত গড়ায়। গ্রাহকের এই অংশটা অন্যদের তুলনায় অগ্রসর ও প্রগতিশীল। তাই তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে অভিযোগ দিয়ে থাকে। ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট (এফআরসিএসডি) নামে ওই বিভাগটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল এসব অভিযোগ প্রতি তিন মাস পরপর সংকলন করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হিসেবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা। এ কাজটি ওই বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েক বছর নিয়মিত করলেও এখন আর করে না। ২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির পর থেকে এ তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন রক্ষণশীল নীতি পরিপালন করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কার্ড সেবা নিয়ে জমা পড়া অভিযোগ ও নিষ্পত্তি হওয়া অভিযোগের সংখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও পেমেন্ট সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের সহায়তা নিয়েও পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্পষ্ট হওয়া সম্ভব হয়নি।
এফআরসিএসডি থেকে কোনো লিখিত বা সংকলিত ত্রৈমাসিক বা ষান্মাসিক তথ্যশিটও দেওয়া হয়নি। বিভাগটি থেকে জানানো হয়েছে, ২০২২-এর জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে মাত্র ৮৫০ অভিযোগ তারা পেয়েছে। এর মধ্যে আবার নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগের সংখ্যাও জানানো হয়নি। বলা হয়েছে- ধরে নেওয়া হয় যে, এফআরসিএসডি সব অভিযোগ নিষ্পত্তি করে দেয়। এ ক্ষেত্রে কখনো কখনো গ্রাহকের দিকেও দোষ খুঁজে পাওয়া যায় বিধায় ওই সব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ধরে নিয়েই এফআরসিএসডি সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে।
কার্ড ব্যাংকিং সেবা বর্তমানে সময়ের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর সুবিধা যেমন অনেক, দুর্ভোগও বিস্তর। ব্যাংকগুলোকে এর সেবার মান উন্নত করার মাধ্যমে গ্রাহকদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে, যেহেতু অভিযোগ আছে- দুর্ভোগের ধরন ও সংখ্যা প্রকাশ করা হয় না। সেহেতু সেবার মান নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। অর্থাৎ কার্ড ব্যবহারকারীর অভিযোগের সংখ্যা ও নিষ্পত্তি সঠিকভাবে খোলাসা হচ্ছে না। যে কারণে গ্রাহকরা কার্ড ব্যাংকিং খাতে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাই এফআরসিএসডি বিভাগকে নিয়মিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে গ্রাহকের অভিযোগ ও নিষ্পত্তির বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।