বহুল আলোচিত হল-মার্ক কেলেঙ্কারি মামলার রায় গত মঙ্গলবার ঘোষণা করা হয়েছে। হল-মার্ক নামে একটি কোম্পানি সোনালী ব্যাংকের শেরাটন হোটেলের (বর্তমানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল) পাশেই বাড়ি ভাড়া নিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি করে। নামসর্বস্ব কাগুজে কোম্পানির নামে ঋণ অনুমোদন করিয়ে ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা বের করে নেওয়ার এই আয়োজন প্রায় বছরব্যাপী চললেও ঘুণাক্ষরেও তা কেউ বুঝতে পারেননি। সোনালী ব্যাংকের রুটিন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিষয়টি নজরে আসে। তাৎক্ষণিক এটি জানাজানি হয় বাংলাদেশ ব্যাংকেও। এরপর ২০১২ সালের মে মাসে ব্যাংক খাতের প্রথম বৃহত্তর ঋণ জালিয়াতির ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১২ সালের ৭ জুন ঋণ জালিয়াতির এই অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে। এ সময়ে দুই দফায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ জালিয়াতিসংক্রান্ত দুটি প্রতিবেদন দুদকে পাঠানো হয়। ওই দুই প্রতিবেদনে হল-মার্ক গ্রুপের ছয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়। অনুসন্ধান কাজ শেষ হলে ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর হল-মার্কের কর্ণধার, ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও অধীনস্থ সহযোগীসহ মোট ২৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা করে দুদক। কিছুদিন পর একজন আসামি মারা যাওয়ায় তার নাম বাদ দিয়ে ২০১৩ সালের ৬ অক্টোবর ২৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে দুদক। দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলায় মঙ্গলবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এর বিচারক মো. আবুল কাসেম এ রায় ঘোষণা করেন।
হল-মার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ ও তার স্ত্রী গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামকে কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে প্রতারণার আরেক ধারায় তাদের সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২৫ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি সাতজনকে কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রতারণার আরেক ধারায় তাদের সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
এ রায়ে সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ সাত কর্মকর্তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রতারণার আরেক ধারায় তাদের সাত বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর রমনা থানায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থের অপব্যবহার এবং পাচারের অভিযোগে ২০১২ সালে মামলা করে কমিশন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, হল-মার্কের ঘটনা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এক বিস্ময়কর। যে অপরাধীরা দেশের জনগণের আমানতব্যবস্থা ও দেশের অর্থনীতিকে খেলা মনে করে তাদের মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন আদালত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আইনে সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এ রায় ব্যাংকিং ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি থেকে স্পষ্ট হয় যে, আর্থিক জালিয়াতি করে কেউ মুক্তি পাবে না। এ রায় একটি রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে বলে অনেকে মনে করেন। ব্যাংকিং খাতে এ রায় সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। প্রতিটি অপরাধের বিচার হলে অপরাধ কমে যাবে। বাংলাদেশে আর্থিক খাতে অনেক অপরাধ হয়েছে বা হচ্ছে। সেগুলো সামনে এনে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি হবে না।