নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-জলাশয়ে রয়েছে পর্যাপ্ত পানি। দেশজুড়ে আছে গভীর-অগভীর নলকূপ। এর বাইরে আরও অনেক উৎস আছে পানির। এ ধরনের সুপেয় পানির প্রকট সংকট। খাওয়ার পানির দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় মানুষকে। ঘরে-বাইরে পানির জন্য রীতিমতো লড়াই করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এমনিতেই সরাসরি সুপেয় পানির উৎস কম; তার ওপর যে উৎসগুলো আছে, তাও বিষাক্ত করে ফেলা হচ্ছে নানাভাবে। আবার সরাসরি পানীয় জল হিসেবে ব্যবহৃত পানিও নানা ধরনের রাসায়নিক, অণুজীব-জীবাণুতে দূষিত হচ্ছে। সুপেয় পানির সংগ্রাম কেবল বাংলাদেশেই চলছে, তা নয়। জাতিসংঘের হিসাবমতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশই সুপেয় পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পানিসংশ্লিষ্ট স্যানিটেশন-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ৪৬ শতাংশ মানুষ।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর পানিসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে জাতীয়ভাবে ১৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরিবারে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের সুযোগ আছে। ৭৬ দশমিক ৮১ শতাংশ নাগরিক গভীর ও অগভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করেন। বাকি ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ অন্যান্য উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করেন। ঢাকা ওয়াসা বলছে, প্রতিবছর ২ থেকে ৩ মিটার করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ৫০ বছর আগেও পানির স্তর ২ থেকে ৩ মিটারের মধ্যে ছিল। বর্তমানে সেখানে ৮৬ মিটার নেমে গেছে। এভাবে নামতে থাকলে ঢাকায় একসময় পানি সরবরাহ করা দুরূহ হয়ে যাবে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মধ্যে রাজধানীতে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূপৃষ্ঠস্থ উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বৃহৎ ৩টি পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে ৭০ ভাগ ভূপৃষ্ঠস্থ পানি আর ৩০ ভাগ ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের ওপর নির্ভরতা নিশ্চিত করে ঢাকাবাসীর মধ্যে পানি সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রোগতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশে দুভাবে মানুষ পানিবাহিত রোগের কবলে পড়েন। একটি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি, আরেকটি তাৎক্ষণিক। প্রাকৃতিক বা মানুষের সৃষ্ট কিছু ভারী রাসায়নিক ধাতুর মিশ্রণে নদী-নালা, খাল-বিল-জলাশয়ের পানি বিষাক্ত হয়, যা নানা প্রক্রিয়ায় মানবদেহে ঢুকে ক্যানসার, লিভার, কিডনি, স্নায়ুর সমস্যাসহ আরও জটিল দীর্ঘমেয়াদি রোগের সৃষ্টি করে। অন্যদিকে কিছু ভাইরাস ও জীবাণু থেকে পানীয় জল দূষিত হয়ে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, গুলেনব্যারি, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, জন্ডিসসহ আরও কিছু রোগের জন্ম দেয়।
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সুপেয় পানি এবং স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। একদিকে সুপেয় পানির উৎসগুলো দ্রুত প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট নানা ধরনের ভারী ধাতুর দূষণে বিষাক্ত হয়ে পড়ছে; অন্যদিকে অপরিকল্পিত পয়োবর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা প্রধান ও জরুরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে পানির স্তর নামছে, অন্যদিকে ঢাকাকে ইটপাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়ার ফলে বৃষ্টির পানি সহজে মাটিতে মিশতে পারছে না। তারা বলছেন, ঢাকা ওয়াসা যেসব পরিকল্পনা নিয়েছে, সেগুলো অনেক ব্যয়বহুল। আশঙ্কাজনক হারে নামছে রাজধানীর পানির স্তর। সুপেয় পানির জন্য চলছে লড়াই।
পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু সেই পানিকে করে তোলা হচ্ছে বিষাক্ত। একদিকে সুপেয় পানির অভাব; অন্যদিকে পানির অপচয় সবই আছে দেশে। পানির অপচয় রোধকল্পে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ঢাকা ওয়াসা সব বিভাগের মধ্যে একটি সুষ্ঠু সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনার জন্য সার্বিক পরিকল্পনা করতে হবে। ভূপষ্ঠের পানি বা নদীগুলোর পানি পানের উপযোগী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।