হাইকোর্ট গত রবিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। রায়টা হচ্ছে মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে কঠোরভাবে এ নির্দেশ মানতে বলা হয়েছে। এই রায়ের পর এখন আর দেশের কোনো হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ল্যাবরেটরি কোনোভাবেই অনাগত শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না, অর্থাৎ সন্তানটি ছেলে না মেয়ে তা আর আগে থেকে প্রকাশের সুযোগ নেই।
বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে খবরটি পড়ে খুব স্বস্তি পেয়েছি। অনুভব করলাম আরও বহু আগেই আদালত থেকে এ ধরনের একটি নির্দেশ আসা দরকার ছিল। তা হলে অনেক অঘটন প্রতিরোধ করা যেত। গর্ভের শিশু মেয়ে হওয়ার কারণে যেসব নারীকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের জীবনটা অন্তত বেঁচে যেত। বাঁচত তাদের মেয়েসন্তানটিও।
খবরের কাগজসহ বিভিন্ন পত্রপিত্রকার ১৫ ফেব্রুয়ারির খবর, আগের তিন সন্তান মেয়ে হওয়ায় ছেলেসন্তানের আশায় স্ত্রীকে চতুর্থ সন্তান নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন স্বামী আরিফুল ইসলাম মনসুর। একসময় অন্তঃসত্ত্বা হন স্ত্রী রেহানা খাতুন। কিন্তু আলট্রাসনোগ্রাফিতে জানা যায়, রেহানার গর্ভে যে সন্তানটি বেড়ে উঠছে সে ছেলে নয়, মেয়ে। তখন মনসুর তার করণীয় ঠিক করে ফেলেন। কোনোভাবেই এই সন্তান হতে দেওয়া যাবে না। সেই উদ্দেশ্যেই রেহানাকে একটি নার্সিং হোমে গর্ভপাত করাতে নিয়ে যান মনসুর। কিন্তু কোনো চিকিৎসক ছাড়াই ক্লিনিক মালিক ও তার স্ত্রী গর্ভপাত করাতে গেলে মারা যান রেহানা খাতুন। হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে শেরপুর সদর উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের তিলকান্দি গ্রামে।
কী নির্মম এ পৃথিবীর মানুষ! শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে একটি মানবশিশুর পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ হলো না! আর মেয়েসন্তান গর্ভধারণ করার অপরাধে মাকে জীবন দিতে হলো! এ কেমন কথা?
মেয়েসন্তান জন্ম দেওয়ার ‘অপরাধে’ স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন অনেক স্বামী। অনেক স্ত্রী হয়েছেন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। বহু সংসার ভেঙে গেছে এই একটি কারণে। এমনও দেখা গেছে, একটি ছেলেসন্তানের আশায় পরপর আটটি মেয়ের জন্ম দিয়েছেন এক দম্পতি। ৯ নম্বর সন্তানটি ছেলে হওয়ার পরই তবে তারা সন্তান জন্মদানে ক্ষান্ত দেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নারীরাও সন্তান হিসেবে ছেলেই কামনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের ২০১৯ সালে করা একটি গবেষণায় এমনটাই দেখা গেছে। ওই গবেষণার ফলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২৮ শতাংশ নারী প্রথম সন্তান হিসেবে ছেলে চান। যা পুরুষদের ক্ষেত্রে ২৪ শতাংশ। ১৯৯৩-৯৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেখা যায়, লিঙ্গভিত্তিক পছন্দে ছেলেসন্তান হোক, তা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
ওই গবেষণায় বলা হয়, এই ‘জেন্ডার বেইজড সেক্স সিলেকশন’ নারীর মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে। অসম শ্রেণির সম্পর্ক, পিতৃতন্ত্র, যৌতুক প্রথা, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, নারীর ওপর চাপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, ঐতিহ্যগত লিঙ্গ ভূমিকাও বাংলাদেশের মানুষকে ছেলে কামনা করতে বাধ্য করে।’
কী দুঃখজনক এ ব্যাপারটা। নির্যাতনের ভয়ে বা পারিবারিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে খোদ মায়েরাও চাইছেন তার সন্তানটি ছেলে হোক!
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন মেয়েরা এত অবাঞ্ছিত যে তাদের জন্মের খবরে অনেকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে? কেন ছেলেসন্তানের জন্য এই উদগ্র আকাঙ্ক্ষা? ছেলেরা বংশ রক্ষা করে, এ জন্য নাকি বুড়ো হলে ছেলে বাপ-মাকে খাওয়াবে? কারণ মেয়ের তো বিয়ে হয়ে যাবে। তাই বাপ-মাকে দেখবে না। একুশ শতকে এসে এমনটি ভাবার কি কোনো সুযোগ আছে?
মেয়েরা আজকাল পড়ালেখা করে মানুষ হচ্ছে। কোথায় নেই মেয়েরা? তারা পাইলট হচ্ছে, চিকিৎসক হচ্ছে, প্রকৌশলী হচ্ছে, আইনজীবী হচ্ছে। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে তাদের দৃপ্ত পদচারণ। ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে নারীরা আসীন হচ্ছে। তারা পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনছে। বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখছে। সমাজে ও পরিবারে তাদের ভূমিকা অনেক। যারা শুধু মেয়ে হওয়ার অপরাধে নিজের সন্তানকে হত্যা করছেন, তাদের চোখে কি এসব কিছুই পড়ে না? আর সব ছেলেই কি তাদের বৃদ্ধ বাপ-মাকে দেখছে? এমনও তো উদাহরণ আছে, যেখানে ছেলে বাবা-মাকে ফেলে গেছে, আর মেয়েটিই বাবা-মায়ের দেখাশোনা করছে। ছেলে আয়োজন করে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসছে– এমন ঘটনা তো আমাদের দেশে হরহামেশাই ঘটছে। তারপরও অনেকের কাছেই মেয়েরা অবাঞ্ছিত। অনেক পুরুষের মনোভাব হচ্ছে মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করব, তাদের বিয়ে করব, তাদের দিয়ে ঘরের কাজ করাব, কিন্তু ঘরে কোনো মেয়েসন্তান জন্ম নেবে না।
একটি কথা সবার জানা প্রয়োজন। সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে, তার জন্য কখনোই মায়েরা দায়ী নন। বাবারাও নন। আমরা জানি প্রত্যেক মানুষের শরীরে ৪৬টি ক্রোমোজম থাকে। সেগুলো দুই প্রকারের। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এগুলো X ও Y নামে পরিচিত। নারীর দেহে থাকে ৪৬টি X ক্রোমোজম। আর পুরুষের শরীরে থাকে ২৩টি X ও ২৩টি Y। পুরুষ ও নারীর শারীরিক সম্পর্কের সময় স্বামীর থেকে ২৩টি X এবং স্ত্রীর থেকে ২৩টি X এসে যে সন্তান হয় তা হয় মেয়ে। আর যদি স্বামীর থেকে ২৩টি Y আসে তাহলে সন্তান হয় ছেলে। তাহলে আমরা দেখতে পাই যে এটা পুরোপুরি স্বামীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তবে X ক্রোমোজম আসবে নাকি Y ক্রোমোজম আসবে, তা স্বামীও বলতে পারেন না।
অতএব, সন্তান ছেলে বা মেয়ে হওয়ার জন্য কাউকে দায়ী করা যাবে না। আর এ বিষয়টি সবাইকে ভালোভাবে বোঝাতে হবে। মানবশিশুর জন্ম নিয়ে নানা রকম ভুল ধারণার অবসান ঘটাতে হবে। ফিরে আসি হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় প্রসঙ্গে। গর্ভে থাকা মেয়েসন্তানের নিরাপত্তায় এ রায় খুব কাজে দেবে বলেই মনে করি। অন্তঃসত্ত্বা মায়ের ওপর নির্যাতন প্রতিরোধেও রায়টি ভালো কাজ করবে। কিন্তু এ জন্য রায়ের বাস্তবায়ন খুব জরুরি। রায় যাতে বাস্তবায়িত হয় সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তৎপর হতে হবে। প্রয়োজনে তাদের কঠোর হতে হবে।
আর কদিন পরই আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ঘটা করে পালন করা হবে দিবসটি। নারী দিবস উপলক্ষে বলতে চাই, মেয়েসন্তানদের বাঁচতে দিন। তাদের জন্ম দিন। তাদের যত্ন নিন। ভালোবাসুন। একদিন এই মেয়েসন্তানই হবে আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আসুন, নারীর জগৎ জয়ের সঙ্গী হোন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
[email protected]

