আমানতকারীদের হিসাব থেকে দুই বছরের মুনাফা কাটার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তা শরিয়াহ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে জানিয়েছেন শরিয়াহ আইন বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শরিয়াহ বোর্ডের মতামত নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানতকারীদের হিসাব থেকে মুনাফা কাটার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং শরিয়াহ পরিপন্থি।
এদিকে আমানতকারীদের প্রবল আন্দোলন এবং চাপের মুখে দুই বছরের মুনাফা কাটার অন্যায্য সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকগুলোর ব্যক্তিগত মেয়াদি ও স্কিমভিত্তিক আমানতকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জমানো টাকার ওপর বার্ষিক ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। এই মুনাফা দেওয়ার হার প্রাপ্যতার তুলনায় অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় তা গ্রাহকদের অসন্তোষ কতটুকু কমাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, গভর্নর একক সিদ্ধান্তে কীভাবে শরিয়াহ আইনের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা সংযোজন করেছেন। শরিয়াহ আইনের আওতায় গ্রাহকদের মুনাফাবঞ্চিত করার কথা বলে আবার চাপের মুখে সিদ্ধান্ত আংশিক পরিবর্তনের ঘোষণা শরিয়াহ আইনের ভিত্তি সম্পর্কে গ্রহাকদের মধ্যে সংশয় তৈরি করবে। শরিয়াহ আইনে গ্রাহককে বঞ্চিত করার কোনো সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের অসাবধানতা, দুর্নীতি বা লুটের কারণে ক্ষতি হলে তার দায় গ্রাহক বা আমানতকারীরা বহন করবে না। বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষকেই দায়ভার নিতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই বিধান স্পষ্টভাবে শরিয়াহ আইনে রয়েছে।
জানা গেছে, শরিয়াহ আইনে যিনি ব্যাংকে আমানত রাখেন, তাকে ‘সাহেব আল-মাল’ বলা হয়। ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় ‘মুদারিব’। লোকসান হলে তার দায় আমানতকারীদের নয়। এ দায় মুদারিব বা প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠিত শরিয়াহ বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের ওপর যে নিরীক্ষা করা হয়েছে, সেই প্রতিবেদনগুলো বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়েছে। বোর্ড বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া দেওয়া হয়নি। তার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের হিসাব থেকে মুনাফা কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বোর্ড জানে না কিসের ভিত্তিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টির সত্যতা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, ‘শরিয়াহ বোর্ড এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক মতামত দেয়নি। তার আগেই গভর্নর ড. আহসান মনসুর শরিয়াহ বোর্ডের দু-একজনের সঙ্গে মৌখিকভাবে কথা বলেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন।’
এ বিষয়ে বিশিষ্ট শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল মো. আবদুল্লাহ শরীফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘গ্রাহককে মুনাফাবঞ্চিত করার যে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে, তা শরিয়াহ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা শরিয়াহ আইনে বলা আছে, লোকসান হলে তার দায় সাহেব আল-মাল বা আমানতকারী বহন করবেন না। এর দায় সম্পূর্ণভাবে বহন করবেন মুদারিব বা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ কোনো ব্যাংক যদি অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই ক্ষতির দায় কোনোভাবেই গ্রাহকের ওপর দেওয়া যাবে না। শরিয়াহ আইনে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ব্যাংকগুলোকে মূলত সুশাসনের ঘাটতি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, যা শরিয়াহ আইন পরিপন্থি। তবে যে ৫টি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে, সেগুলোর সবগুলোই যেহেতু শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, সেই হিসেবে শরিয়াহ আইনকে প্রাধান্য দিয়েই সরকারের উচিত বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা।’
একই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে যদি ব্যাংকের লস হয়, তাহলে গ্রাহক ব্যাংকের কাছে বাধ্যতামূলক লাভ চাইতে পারবেন না। তবে যে ৫টি ব্যাংকের কথা বলা হয়েছে, সেখানে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে দেখা যাচ্ছে না। বরং এসব ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাট করে পাচারের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ সেখানে ব্যাংকের অবহেলার কারণে লোকসান হয়েছে। শরিয়াহ আইনে স্পষ্ট বলা আছে, ব্যাংকের অবহেলার কারণে লোকসান হলে গ্রাহক দায়ী হবেন না। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক শরিয়াহ আইন অমান্য করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।’
এদিকে শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া মুনাফা কাটার সিদ্ধান্ত গ্রাহকরা অগ্রহণযোগ্য মনে করছেন। তারা বলছেন, ‘আমরা শরিয়াহ আইন মেনেই এসব ব্যাংকে আমানত রেখেছিলাম।’ তারা বলেন, ‘শরিয়াহ পরিপন্থি এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে এর ফলাফল ভালো হবে না।’ এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব ও এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক আলিফ রেজা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক শরিয়াহ আইন অমান্য করে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আমরা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। আর ৫টি ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন করার পর বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে, তাহলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক তো বটেই, দেশের কোনো ব্যাংকের প্রতিই গ্রাহকের আস্থা থাকবে না।’
অন্যদিকে দুই বছরের মুনাফা কাটার সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকাররাও বেকায়দায় পড়েছেন। প্রতিদিনই ব্যাংকে ভিড় করছেন অসন্তুষ্ট গ্রাহকরা, যারা ব্যাংকারদের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যাংক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা গ্রাহকদের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারছি না। প্রতিদিনই ব্যাংকে ভিড় করছেন অসন্তুষ্ট গ্রাহকরা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করছি।’
এ ছাড়া পাঁচ ব্যাংকের একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের উদ্বেগের কথা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রশাসক বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমাদের মনোনীত করার পর ব্যাংকে যোগ দিয়েছি। বেশ ভালোভাবেই আমরা ব্যাংকগুলোকে গুছিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ হেয়ারকাটের সিদ্ধান্তে আবার আমানতকারীদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত
গতকাল বুধবার রাতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রশাসকের কাছে নতুন সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সে অনুযায়ী, উক্ত সময়ে (২০২৪-২৫) ব্যক্তিগত (অপ্রাতিষ্ঠানিক) মেয়াদি আমানত ও স্কিমভিত্তিক আমানতের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেট অর্থাৎ বার্ষিক ৪ শতাংশ হারে মুনাফা প্রদান করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সব আমানত স্থিতি পুনরায় হিসাবায়ন করতে হবে। পুনঃহিসাবায়নের ফলে যে আর্থিক প্রভাব পড়বে, তা উল্লেখ করে একটি সমন্বয় বিবরণীসহ সংশোধিত আমানত ও মুনাফার তথ্য তিন কার্যদিবসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন ডিপার্টমেন্টে জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া মাসিক বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর মুনাফাভিত্তিক আমানতের ক্ষেত্রে যদি ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংক রেটের চেয়ে বেশি মুনাফা ইতোমধ্যে প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অতিরিক্ত অর্থ ভবিষ্যতে প্রদেয় মুনাফার বিপরীতে কিস্তি আকারে সমন্বয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত পরিশোধসূচি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত মেয়াদি ও স্কিমভিত্তিক আমানত ছাড়া অন্যান্য সব ধরনের আমানতের ক্ষেত্রে আগের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।