একবিংশ শতকের যুগান্তকারী উন্নয়নের রূপ পেল বাংলাদেশ। যোগাযোগব্যবস্থার এক বৈপ্লবিক অর্জনে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচিত হলো। এই টানেল কর্ণফুলী নদীর দুই প্রান্তকেই শুধু আলোয় আলোকিত করেনি, দক্ষিণ এশিয়ার প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়েকে যুক্ত করার পথও প্রসারিত করল। জনগণের জীবনমান এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ টানেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানেলটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী টানেলের উদ্বোধন করেন। এটি উদ্বোধনের মাধ্যমে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে গেল।
‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেলে দেশের পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থায় উন্নয়ন, এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক সংযুক্তিসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়াধীন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে চার লেনবিশিষ্ট সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৬৮৯.৭১ কোটি টাকা। যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থসহায়তা ৪৬১৯.৭১ কোটি টাকা এবং চীন সরকারের অর্থসহায়তা ৬০৭০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ৯.৩৯ কিলোমিটার। মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩.৩১৫ কিলোমিটার। টানেলের সর্বোচ্চ গভীরতা পানির উপরিতল থেকে ৪২.৮০ মিটার এবং নদীর তলদেশ থেকে ৩১ মিটার।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, সাতটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই টানেলটির কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপগোগী সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ডাউন টাউনকে যুক্ত করা এবং উন্নয়ন কাজ ত্বরান্বিতকরণ। চট্টগ্রাম পোর্টের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকরণ এবং প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে নতুন একটি সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা। চীনের সাংহাই শহরের আদলে চট্টগ্রাম শহরকে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেলে গড়ে তোলা। কর্ণফুলী নদীর ওপর বিদ্যমান দুটি সেতুতে যানবাহনের বাড়তি চাপ কমানো।
বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পের প্রথম প্রকল্প পরিচালক ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. লিয়াকত আলী ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, ‘২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপিতে মোট ৭৩৫.১৮ কোটি টাকা (জিওবি খাতে ৫২৩.৬৬ কোটি ও প্রকল্প সাহায্য ২১১.৫২ কোটি) বরাদ্দ রয়েছে। আগস্ট ২০২৩ পর্যন্ত জিওবি খাত হতে ১২.৪৮৬৭ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য খাত থেকে ১০.২৬৭৮৫ কোটি টাকাসহ মোট ২২.৭৫৪৫৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অদ্যাবধি পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় পতেঙ্গা ও আনোয়ারা প্রান্তের ২৯৬০ জন ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিক/ব্যক্তিকে অতিরিক্ত মঞ্জুরির অর্থ বাবদ সর্বমোট ৩৫৮.০৩৮৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু টানেল সরকারের একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উন্নয়ন প্রকল্প। এটি দেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান ইতিবাচক অবদান রাখবে। এখানে কেইপিজেড ও চীনা ইকোনমিক জোন আছে। শিল্পায়নের সুযোগ থাকায় আগামীতে আরও নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে অভাবনীয় এক পরিবর্তন আনবে এ টানেল। এতে চট্টগ্রাম মূল শহরের সঙ্গে সাগর ও বিমানবন্দরের দূরত্ব কমে আসবে। পণ্য পরিবহনে বাঁচবে অতিরিক্ত খরচ, সাশ্রয় হবে সময়। মাত্র ৩ মিনিটেই পাড়ি দেওয়া যাবে কর্ণফুলী নদী। নদীর তলদেশে তৈরি টানেল শিল্পায়নের গতিও বাড়বে। গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্পকারখানা।
চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্নের সাংহাই আরেক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। সাংহাইওয়ের আদলে নদীর দুই পাড় নিয়ে তৈরি হবে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম নদীর দুই তীরে দুটি টাউন দেখতে পথ চেয়ে আছে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক থাকছে। আনোয়ারা প্রান্তে রয়েছে ৭২৭ মিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ১৮ থেকে ৩৬ মিটার গভীরতায় সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। টানেলকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের মিরসরাইর জোরারগঞ্জ থেকে কক্সবাজারে শহরতলি পর্যন্ত নির্মিত হবে মেরিন ড্রাইভ। দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে।
সমীক্ষা বলছে, টানেল দিয়ে বছরে প্রায় ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করবে। তিন বছর পর সংখ্যা দাঁড়াবে ৭৬ লাখ। ২২ টনের বেশি ওজনের যান চলাচল করতে পারবে। ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি করা হয়েছে। ট্যানেলটি চালু হলে প্রতিদিন গড়ে ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করবে। দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার প্রসারে এই টানেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে টানেলটি সংযোগ স্থাপন করবে। আধুনিক যোগাযোগের স্বর্ণদ্বারে পৌঁছাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার। এতদঞ্চলে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে। টানেলটির ফলে অত্র অঞ্চলের প্রস্তাবিত শিল্প এলাকা নতুন গতিতে প্রস্ফুটিত হবে।
বেকার তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বাড়বে প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান। টানেল চালু হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে শূন্য দশমিক ১৬৬ শতাংশ। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হলে রপ্তানি বাড়বে। নতুন নতুন পর্যটনের বিকাশ ঘটবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে দুই পাড়ের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা ও জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।