গত মঙ্গলবার পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করেছে সরকার। ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু নতুন বেতনকাঠামো প্রত্যাখ্যান করেছেন শ্রমিকরা। বিরাজ করছে শ্রমিক অসন্তোষ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অসন্তোষ প্রকাশ করে সমাবেশের ডাক দেন। গাজীপুরে গত বুধবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক শ্রমিক নিহত হন।
শ্রমিকপক্ষ বলছে, শ্রম অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে, কারণ ন্যূনতম মজুরি যৌক্তিকভাবে করা হয়নি। আবার মালিকপক্ষ মনে করছে নতুন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়ন তাদের জন্য কঠিন হতে পারে। যদিও মজুরি বোর্ডের সুপারিশ তারা মেনে নিয়েছেন। সাধারণ শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ইতিবাচকভাবে দেখলেও শ্রমিকদের ১১টি সংগঠন এটি প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ সমাবেশ অব্যাহত রেখেছে।
তথ্য বলেছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যখন পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়িত হয়, তখন ৬ শতাংশেরও কম মূল্যস্ফীতি ছিল। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষাপটে এখন তা প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। পোশাকশ্রমিকেদের মজুরিকাঠামোয় গ্রেড থাকে সাতটি। নতুন কাঠামোয় সেটি কমিয়ে পাঁচটি করা হয়েছে। এ দাবি ছিল শ্রমিকপক্ষের। বিশ্লেষণ বলছে, ওপরের গ্রেডগুলোতে মজুরি বৃদ্ধির হার কিছুটা কম।
এদিকে সরকারঘোষিত ন্যূনতম মজুরি জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত নয় দাবি করে মজুরি বোর্ডে আপিল করতে যাচ্ছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। গত বুধবার একাধিক সংগঠনের নেতারা খবরের কাগজকে বলেছেন, শ্রম আইনের ১৩৯ ধারা অনুযায়ী আগামী ১৪ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের আপিল করার সুযোগ রয়েছে এবং তা তারা করবেন।
শ্রমিকদের উদ্দেশে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলছে, এমন কাজ করবেন না যাতে পোশাকশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডিসেম্বর থেকেই ঘোষিত নতুন মজুরি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান।
শ্রমিক হত্যার নিন্দা জানিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। এই সমাবেশ থেকে শ্রমিকনেতারা সর্বনিম্ন ২৩ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন। ১১টি শ্রমিক সংগঠনের মোর্চা ‘মজুরি বৃদ্ধিতে গামেন্ট শ্রমিক আন্দোলন’-এর নেতারা গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। বিজিবি সদর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, পোশাক কারখানার নিরাপত্তায় ঢাকা ও আশপাশের জেলায় ৪৮ প্লাটুন বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) মোতায়েন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ঈসমাইল বলেন, ‘ওয়েজ বোর্ড কর্তৃক যে বেতনকাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে, তা দিয়ে শ্রমিক পরিবারের ক্যালরির চাহিদা মিটবে না।’
শ্রমিকনেতারা বলেছেন, শ্রমিকরা নাশকতা করেন না। কোনো শ্রমিক যদি নাশকতামূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে থাকেন, তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনা হোক।
গত বুধবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি মনিটরিং ও রিজার্ভ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। প্রত্যেক শ্রমিককে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। তাতে মাসে অন্তত ৫০০ টাকা সাশ্রয় হবে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যেটা দেওয়া হয়েছে, সেটা ভালো। আমার মনে হয়, অধিকাংশ মানুষই সেটা মেনে নেবেন।’
শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শ্রমিকরা যেন কোনো ধরনের সহিংসতা ও প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের ভয় ছাড়াই সভা-সমাবেশ করতে পারেন এবং নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে পারেন, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে বলেছে দেশটি।
বাংলাদেশে পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে প্রশংসিত। সুতরাং এ সেক্টরটিকে গতিশীল রাখা দরকার। শ্রমিকদের অসন্তোষ জিইয়ে রাখা এবং মালিকদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা কোনোটিই সুখকর হতে পারে না। উভয় পক্ষকেই শিল্প খাতটি রক্ষার স্বার্থে শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসতে হবে।