দু-এক দিনের মধ্যেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। এ নিয়ে দেশে বিরোধী দলের টানা অবরোধ কর্মসূচিও চলছে। এখন বিষয় হলো, বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে আওয়ামী লীগের বিকল্প ভাবনা বা কৌশল কী হবে?
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা মনে করছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রতি নমনীয় থাকবে ক্ষমতাসীন দল। দলমত-নির্বিশেষে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে উৎসাহ দেওয়া হবে।
এদিকে নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির (জাপা) নাটকীয়তায় দেখা দিয়েছে নতুন মোড়। ‘৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে জাপা’ দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের এমন বক্তব্যে নির্বাচনী তোড়জোড় শুরু করা নেতাদের অনেকেই এখন সিদ্ধান্ত বদল করেছেন।
নির্বাচন কমিশন সচিব বলেছেন, ‘এ সপ্তাহেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হবে।’ এখন চলছে সংলাপের তোড়জোড়। এরই মধ্যে সহিংসতা পরিহার করে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে শর্তহীন সংলাপের জন্য প্রধান তিন দলকে চিঠি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে এ চিঠি পাঠিয়েছেন।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মেরূকরণের কিছুটা প্রভাব পড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাদের মতে, চীন, ভারত ও রাশিয়া সংবিধানের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা এবং বাংলাদেশের জনগণের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে এখনো তাদের অবস্থানেই রয়েছে। তথ্যমতে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত ঐকমত্য হয়নি। এই মতানৈক্যের বিষয়ে নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনকে বুঝিয়েছে, বাংলাদেশে এমন কোনো শক্তির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া উচিত নয়, যাদের কারণে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে তফসিল সামনে রেখে ‘নির্বাচন হয়ে যাবে’ এমন আলোচনা অব্যাহত থাকলেও অনেকেই সংলাপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তাদের মতে, সংলাপ ও আলোচনার জন্য চাপ দুই দলের ওপরই যেমন আছে; পাশাপাশি বড় দলগুলোর নেতাদের কারও কারও মধ্যে সংলাপের জন্য তাগিদও রয়েছে। ফলে তারা মনে করেন, সংলাপ তফসিলের আগেও হতে পারে, এমনকি পরেও হতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ‘সংলাপ সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। সরকার চাইলে যেকোনো সময় সংলাপ করতে পারে। তফসিলের আগেও পারে, পরেও পারে। ইচ্ছা করলে তফসিল পিছিয়েও করতে পারে।’ তার মতে, ‘মৃত্যুর আগেও মানুষ বাঁচতে চায়।’ যুদ্ধক্ষেত্রেও আলোচনা সমঝোতা হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারি দলের নেতাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও ভাষা দেখলে মনে হয় না সংলাপ হবে। কিন্তু এটিও ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব শেষ পর্যন্ত কী করে, সেটা দেখার বিষয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমারা যদি সত্যি সত্যি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তাহলে দেশের কতটা ক্ষতি হতে পারে, তা নিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সবারই চিন্তা করা উচিত।’
বাংলাদেশকে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দেশের চলমান সংকট সমাধানে আলোচনা বা সমঝোতাই এখন মুখ্য বিষয়। এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সমস্যা সমাধানে সব পক্ষকেই এক হয়ে দেশের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ সমাধান সবাই প্রত্যাশা করে।