যেসব প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করেছে, তাদের চিহ্নিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর মাঠে নেমেছে। সূত্র জানায়, পণ্যের পরিমাণ, মূল্য, বিল অব এন্ট্রি ও ইনভয়েসে দেওয়া তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে- এমন সব প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে পাঠাতে বলা হয়েছে। এটা অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ।
অর্থ পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে করণীয় নির্ধারণে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। বৈঠকে আমদানি-রপ্তানিতে অর্থ পাচারের অন্যতম কারণ হিসেবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকে দায়ী করা হয়। এনবিআরের সক্ষমতা ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনবিআরের সমন্বয় বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠনের অংশগ্রহণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর কথা বলা হয়।
এনবিআরের শুল্ক বিভাগের তথ্যমতে, দেশে বন্ড সুবিধার আওতায় তালিকাভুক্ত ৮ হাজার ৪২২ জন আমদানিকারক রয়েছেন। সব মিলিয়ে আমদানি-রপ্তানিকারকের সংখ্যা ২০ হাজারের ওপরে। ১০ হাজার নিবন্ধিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রয়েছেন।
বন্ড সুবিধায় স্বচ্ছতা আনতে, শুল্ক গোয়েন্দার সুপারিশে আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের প্যাকেট বা মোড়কের গায়ে রপ্তানি কাজে ব্যবহৃত পণ্য, খোলাবাজারে বিক্রি ও ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এমন সতর্কীকরণ লিখে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে তিন মাস পরপর বৈঠক করে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করতে, কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যার হাউসের মাধ্যমে পণ্য ছাড়করণে, প্রতি ছয় মাসে বন্ডেড ওয়্যার হাউসের তালিকা হালনাগাদ করতে, লিয়েন ব্যাংক থেকে তথ্য নিয়ে খতিয়ে দেখতে, ওয়্যার হাউসের ভ্যাট নিবন্ধন যাচাই করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থ পাচার রোধে নেওয়া পদক্ষেপের অংশ হিসেবে শুল্ক গোয়েন্দারা আমদানি-রপ্তানি সম্পর্কিত ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে এবং শুল্ক স্টেশনে চিঠি পাঠিয়ে সব ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং এজেন্টের তালিকা সংগ্রহ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ তালিকা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে।
তদন্তকাজে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থ বিভাগ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, কাস্টমস হাউসসহ আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়া হবে।
শুল্ক গোয়েন্দারা কাস্টমস হাউস এবং শুল্ক স্টেশনের পাঠানো তালিকা থেকে বিস্তারিত তদন্তের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাছাই করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা কাঁচামালের পরিমাণ, মূল্য, মজুরিসহ কারখানার অন্যান্য ব্যয় ও আমদানি-রপ্তানি সম্পর্কিত সব ধরনের তথ্যের সঙ্গে এলসিতে দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। কতটা পণ্য কী দামে রপ্তানি হয়েছে এবং রপ্তানির কতটা অর্থ দেশে এসেছে তার গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে।
খবরের কাগজকে বলেন, ‘অর্থ পাচার রোধে শুল্ক গোয়েন্দার সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে ভুয়া রপ্তানি কমবে। আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট গরমিল ৯০ শতাংশ ঠিক হয়ে যাবে। এতে অর্থ পাচার কমবে।’
সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রতি ছয় মাসে এনবিআর কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ী সংগঠনের সহায়তায় ওয়্যার হাউসের তালিকা হালনাগাদ করা, নিয়মিত ওয়্যার হাউসের ভ্যাট নিবন্ধন যাচাই এবং লাইসেন্স নম্বর উল্লেখ না থাকলে আমদানি-রপ্তানিতে অনুমতি না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অনেক সময় ব্যবসায়ীরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য আমদানি করে কারখানায় ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। এ দুর্নীতি বন্ধে ইউডি ইস্যুর পর ইউডির
তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের লিয়েন ব্যাংকের তথ্য মিলিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। অর্থাৎ যে নির্দেশনা বা সুপারিশগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে সংশ্লিষ্ট অংশীগণের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অটোমেশন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানি-প্রক্রিয়া যেন দীর্ঘমেয়াদি না হয় এবং পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা থাকে, সেদিকটাও নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থ পাচার রোধে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কার্যক্রমের গতিশীলতা আনয়নে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। সঠিকভাবে দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউস ও কাস্টমস স্টেশনে ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেক্ট বাস্তবায়ন করতে হবে।