মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ এখন দিশেহারা। নিম্ন আয়ের মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ। দিন আনে দিন খায় যারা তাদের অবস্থা আরও করুণ। মধ্যবিত্তরা কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারছেন না। কেউবা ঋণ নিচ্ছেন, কেউবা অনাহারে কাটিয়ে দিচ্ছেন। আবার অনেকেই তার গচ্ছিত সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। অনেকের মাসিক যে আয় সংসার চালাতেই মাসের মাঝেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি আজ এমন হয়েছে। অনেকেই ইতোমধ্যে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সাধারণ মানুষ আর চলতে পারছেন না। তারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার সব টাকা তুলে নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২১ হাজার ৬৫ কোটি ৫ লাখ টাকার। এর মধ্যে আগের মূল টাকা ও মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ২২ হাজার ৯২১ কোটি ২ লাখ টাকা। মূল টাকা ও মুনাফা পরিশোধের পর তিন মাসে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণের চেয়ে পরিশোধের পরিমাণ বেশি।
দেশের মানুষের একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। সেই সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগে কঠোর নিয়ম চালু করেছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে এখন মেয়াদপূর্তির পর যে হারে সঞ্চয়পত্র ভাঙছে, সেই হারে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ কমে ঋণাত্মক (নেগেটিভ) প্রবৃদ্ধিতে নেমেছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অতিমাত্রায় সুদের চাপ কমাতে গত দুই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে নানা শর্ত দেওয়া হয়। যে কারণে এ খাতে বিনিয়োগ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বাজেটে ঘাটতি পূরণে সরকার সঞ্চয়পত্রের নির্ভরতাও কমিয়ে ফেলেছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ৬ হাজার ৭৪৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে আগের মূল টাকা ও মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ৬ হাজার ৮৯৩ কোটি ৬৪ টাকা। সঞ্চয়পত্রের মূল টাকা ও মুনাফা পরিশোধের পর সেপ্টেম্বর মাসে এ খাতে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৪৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নেওয়ার চেয়ে আগের সুদ-আসল পরিশোধ করেছে বেশি। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ গত সেপ্টেম্বরে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ না নিয়ে উল্টো পরিশোধ করেছে।
অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব সঞ্চয়পত্রের ওপর পড়েছে। ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার কম এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দার কারণে বেশ কয়েক বছর সঞ্চয়পত্র বিক্রয় বেড়ে গিয়েছিল। এতে সরকারের ঋণের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
দুর্নীতি এবং অপ্রদর্শিত আয়ে সঞ্চয়পত্র ক্রয় বন্ধ করতে ক্রেতার তথ্যের একটি ডাটাবেস সংরক্ষণের লক্ষ্যে অভিন্ন সফটওয়্যারের ব্যবহার শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমাতে চাচ্ছে। এতে করে সরকারকে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে অনেক বেশি ঋণ নিতে হবে। যা ব্যক্তি খাতে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বজুড়েই চলছে অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি। আর্থিক সংকটের কারণেও সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমছে।
শুধু আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় অনেকে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এক কথায় শর্তের বেড়াজালে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে আটকে যাচ্ছে। মূলত সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে নানা বাধ্যতামূলক শর্ত আরোপ ও কর বাড়ানোর ফলে এ খাতে বিনিয়োগ কমছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ সহজ করতে হবে। এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগে কঠোর অবস্থানে সরকার।
অর্থ বিভাগের তথ্যমতে, সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে পূর্বের মতো প্রবৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বিষয়গুলো হলো সঞ্চয়পত্র কেনার প্রক্রিয়া অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। বিনিয়োগসীমা নামিয়ে একটি ‘যৌক্তিক পর্যায়ে’ আনা হয়েছে। মুনাফার হারের কয়েকটি স্তর করা হয়েছে। এসব সংস্কার কার্যকর করায় সঞ্চয়পত্রে মানুষের বিনিয়োগ আগের তুলনায় কমেছে।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা পান। সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার নগদ ঋণ পায়। এটি সরকারের ঋণ। এই ঋণ এখন জটিল শর্তের কারণে কমছে। সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছে যেটি অর্থনীতির জন্য হুমকি। অর্থনীতিবিদরা এটি সমর্থন করেন না। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন সঞ্চয়পত্র বিক্রির শর্ত সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এনে এখান থেকে সরকার ঋণ নিক। এটি অর্থনীতি বান্ধব সিদ্ধান্ত হবে। সরকারের উন্নয়নকাজ ও বাজেট ঘাটতি পূরণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভরসার জায়গা ছিল সঞ্চয়পত্র। কিন্তু সেটাতে এত কড়াকড়ি করায় অনেকেই উৎসাহ হারিয়েছেন। মানুষকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সরকারকে নিয়মের শর্তগুলো শিথিল করতে হবে।