অবশেষে এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হলো। এইচএসসি পরীক্ষার ফল কেমন হবে তা নিয়ে যেমন উদ্বিগ্ন ছিলেন অভিভাবকরা, তেমনি শিক্ষার্থীরাও। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২৬ নভেম্বর গণভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল তুলে দেন শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানরা।
চলতি বছরের ১৭ আগস্ট এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা কিছুদিন পর শুরু হয়েছিল। এইচএসসির পাঠ্যসূচি অনুযায়ী একটি বিষয় ছাড়া সব বিষয়ে পূর্ণ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। শুধু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষা ১০০ নম্বরের পরিবর্তে ৭৫ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। করোনার পর এ বছরই পূর্ণ নম্বর ও সময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো।
এ বছর মোট ১৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩৪২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ফরম পূরণ করেছিল। কিন্তু পরীক্ষায় অংশ নেয় ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫২ জন পরীক্ষার্থী।
এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সব বোর্ডে পাসের হার ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পরীক্ষায় পাসের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯২ হাজার ৫৯৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৪৯ হাজার ৩৬৫ জনই ছাত্রী। গত বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল ছাত্রীরা। তখন ছাত্রদের পাসের হার ছিল ৮৪ দশমিক ৫৩ ভাগ এবং ছাত্রীদের ৮৭ দশমিক ৪৮ ভাগ। মোট ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮২ জন জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৫ হাজার ৭২১ জনই ছাত্রী।
ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার ৭৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, বরিশাল বোর্ডে ৮০ দশমিক ৬৫, চট্টগ্রামে ৭৩ দশমিক ৮১, কুমিল্লা বোর্ডে ৭৫ দশমিক ৩৪ এবং রাজশাহী বোর্ডে ৭৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ বলে তথ্য পাওয়া যায়।
এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষাবোর্ডের ২ হাজার ৬৫৮টি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯১৫ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ৮৯ হাজার ২৩ জন এবং ছাত্রী ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯২ জন।
ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাসের হারেও ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে আছে ছাত্রীরা। ছাত্রীদের পাসের হার ৮০ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং ছাত্রদের পাসের হার ৭৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। তা হলে কি ছাত্ররা লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে উঠছে? কী কারণে ছাত্ররা পিছিয়ে পড়ছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
করোনা মহামারির পর বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়েছিল। তবে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অভিভাবকরা সন্তুষ্ট। যদিও শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন তারা। কারণ একাডেমিক পরীক্ষার ফল ও ভর্তি পরীক্ষার নম্বর মিলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ মিলবে।
এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল না করায় কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়। এটা খুবই দুঃখজনক। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতনতা প্রয়োজন। পরীক্ষায় ভালো না করলে কোনো কোনো অভিভাবক ছেলেমেয়েকে বকাঝকা করেন, মারধর পর্যন্ত করেন। এটা ঠিক নয়। ভালো ফলই জীবনের শেষ কথা নয়।
জীবনে সাফল্য অর্জন করতে একাডেমিক ভালো ফল না করা বা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেলে কি জীবন থেমে যাবে? এজন্য শিক্ষক- অভিভাবকসহ শিক্ষার্থী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে। তাহলেই আমাদের শিক্ষার্থীরা বর্তমান সময়ের উপযোগী করে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। একাডেমিক ভালো ফল না করেও অনেকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে যেতে পারেন, তার অসংখ্য নজির রয়েছে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি আমদের অবশ্যই নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। ভালো ফলের পাশাপাশি আমাদের মানসম্পন্ন শিক্ষার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে ভালো ফল অর্জন করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে চাই মানসম্পন্ন শিক্ষা।