বাংলাদেশের প্রায় ১০ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৬০ লাখ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। সদ্য প্রকাশিত জনশুমারি অনুসারে দেশে সব ধরনের প্রতিবন্ধীর মোট সংখ্যা ২২ লাখ ৬৫ হাজার ২০১; যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি খুলনায় এবং সবচেয়ে কম ঢাকায়। কিন্তু সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার প্রতিবন্ধীকে! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনিতেই দেশের সব প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এর মধ্যে উল্টো প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যার চেয়ে বেশি ভাতা কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত রবিবার পালন করা হলো আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের সঙ্গে জাতীয় উন্নয়নের যোগসূত্র আছে। প্রতিবন্ধীদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হলে তারা জাতীয় উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতায় প্রভূত অবদান রাখতে পারবে। জাতিসংঘের নেতৃত্বে গত রবিবার আন্তর্জাতিকভাবে ৩২তম এবং জাতীয়ভাবে ২৫তম প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হয়েছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্মিলিত অংশগ্রহণ, নিশ্চিত করবে এসডিজি অর্জন’।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(১) নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব নাগরিকের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করেছেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, দেশের ২৩ লাখ ৬৫ হাজার প্রতিবন্ধীকে মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আগে জনপ্রতি ২০০ টাকা পেলেও গত অর্থবছর থেকে এই ভাতা জনপ্রতি ৮৫০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। মোট ২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ১ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিবন্ধীর জন্য ৯৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপ অনুসারে, বাংলাদেশের প্রায় ৮ থেকে ১০ ভাগ মানুষ প্রতিবন্ধী।
সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কেনাকাটায় খরচের ক্ষেত্রে ৬৫৮টি অডিট আপত্তি জমা হয়েছে (১৯৬টি নতুনসহ) ১ হাজার ৩৮৯ কোটি ৮৪ হাজার টাকার। এর মধ্যে ৫০৫টি আপত্তির বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৮১৫ কোটি। এই বিপুল টাকা খরচে অডিট আপত্তির মধ্যে অন্যান্য খাতের পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দকৃত বিভিন্ন প্রকল্পের খরচের গরমিলের বিষয়টিও উঠে আসে। খবরের কাগজের তথ্যমতে, এমন কয়েকটি ঘটনায় বিভাগীয় মামলাও চলছে। প্রতিবন্ধীদের ভাতা নিয়ে নয়ছয়ের ঘটনাও ধরা পড়েছে কিছু ক্ষেত্রে। সমাজসেবা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দেশে প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভাতা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের প্রয়াস অনেকাংশেই খর্ব ও ম্লান হয়ে পড়ছে অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে। তাদের মতে, সরকারের উচিত এসব ক্ষেত্রে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. খায়রুল আলম সেখ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জনগোষ্ঠীর চেয়ে বেশি মানুষকে ভাতা দেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়। হতে পারে আবেদনের ক্ষেত্রে বা অন্য কোনো কারণে ঝামেলা হয়েছে। এটা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’
প্রতিবন্ধীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। অবহেলা নয়, তারা এই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের সুশিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা দরকার।