সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সক্রিয়তা দিবস পালন করা হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আজ মানসিকতার বৈকল্য চোখে পড়ে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের ক্ষেত্রে। এখনো চলছে কন্যাশিশু ও ভ্রূণ হত্যা। দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণে অনেক লোমহর্ষক চিত্র পাওয়া গেছে। পুত্রসন্তান না হওয়ার ক্ষোভে যত কন্যাসন্তান হত্যার ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, দেশের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও সহিংসতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তা যথেষ্ট। প্রতিদিনই চলছে বিভিন্ন স্থানে ভ্রূণ হত্যার ঘটনা। যার সঠিক পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই।
জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক তহবিলের (ইউএনএফপিএ) পরিসংখ্যানের তথ্যমতে, দেশে ১৮ শতাংশ নারী ছেলেসন্তান চান। ৪০ শতাংশ মানুষ ছেলে না মেয়েসন্তান হবে, তার আগাম পরীক্ষা করান। আর ৬ শতাংশ মানুষ সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে মেয়ে ভ্রূণ নষ্ট করেন। বিশ্বজুড়ে ছেলেসন্তানের আশায় বছরে ১৫ লাখ মেয়েশিশুর ভ্রূণ নষ্ট করা হয় এবং জন্ম নেওয়ার পর আরও ১৭ লাখ মেয়েশিশুর মৃত্যু হয় অবহেলা ও বৈষম্যজনিত কারণে। সংস্থাটির বাংলাদেশে পরিচালিত জরিপের তথ্য বলছে, ১০০ মেয়েসন্তানের বিপরীতে বর্তমানে ১০৫ জন ছেলেসন্তান জন্ম নিচ্ছে।
দেশে এখনো সন্তান জন্ম নেওয়ার আগে বাবা-মায়ের প্রত্যাশা থাকে ছেলেসন্তান। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা ও সমাজব্যবস্থার কারণে পরিবারগুলোতে প্রচলিত বিশ্বাস হলো, ছেলেসন্তান পরিবারকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করবে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের দেখাশোনা করবে এবং বংশ পরিচয় বাঁচিয়ে রাখবে। গর্ভে প্রত্যাশা অনুযায়ী ছেলেসন্তান না এলে অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েভ্রূণ হত্যা করা হয়। এমনকি অবহেলা দেখানো হয় মেয়ে নবজাতকের ক্ষেত্রে। এমআরের নামে অনেক কন্যাভ্রূণ হত্যা করা হচ্ছে। কন্যাসন্তানকে বোঝা হিসেবে নয়, তাদের সম্পদ হিসেবে ভাবতে হবে।
বিশ্বের সব মুসলিম দেশে ভ্রূণ হত্যা আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু তিউনিশিয়ায় ভ্রূণ হত্যার বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে কন্যাভ্রূণ হত্যা রোধে লিঙ্গ নির্ণয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কোনো ধর্মেই মানুষ হত্যা বা ভ্রূণ হত্যা সমর্থন করে না। সামাজিক অনাচার ও কুসংস্কারের কারণে ভ্রূণ হত্যার মতো অমানবিক ঘটনার পাহাড় জমছে দিনে দিনে। ইসলাম ধর্মে এ রকম ঘটনাকে চরম অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, পাকিস্তানে ভ্রূণ হত্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব জায়গায় কুপ্রথা হলো, আধুনিক বিজ্ঞানের প্রয়োগে লিঙ্গ নির্ধারণ করে অবাঞ্ছিত হলে গর্ভপাত করানোর অভ্যাস। নারীদের দাবিয়ে রাখার প্রবণতা থেকে পুরুষপ্রধান সমাজে এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। আধুনিক যুগে এসেও সমাজব্যবস্থায় এ ধরনের গড্ডলিকাপ্রবাহ মেনে নেওয়া কঠিন। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজের কন্যাশিশুরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলা, বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার। বর্তমান আধুনিক সমাজব্যবস্থায় এসেও দেখা যায় ছেলেসন্তানকে বংশের প্রদীপ মনে করা হয়। কন্যাসন্তান জন্মের ক্ষেত্রে একজন নারী বা পুরুষের ভূমিকা কতটুকু- এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সত্য অনেক শিক্ষিত পুরুষও মানতে চান না। ফলে সমাজের হাজার হাজার নারী কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অভিযোগে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। অনেক সময় খবরের শিরোনাম হয়ে আসে। কন্যাসন্তান নিয়ে পারিবারিক কলহে কখনো মা কখনোবা বাবা তাদের সন্তানকে হত্যা করছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী আইনজীবী সুলতানা কামাল খবরের কাগজকে বলেন, নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই নারী আজও অবহেলিত। সামাজিক ফতোয়ার বলিদান অধিকাংশ নারী আজও সমাজের চোখে বোঝা হিসেবে গণ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশে সফল নেতৃত্বের বিকাশে কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করতে হবে। তাদের সুদক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্য নিরসনে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়া জরুরি।