দেশের অনেক সৎ ব্যবসায়ী শুধু মুনাফার আশায় নয়, দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে প্রসাধন ব্যবসায় জড়িত হয়েছেন। প্রসাধনের অবৈধ কারবারের কারণে সৎ প্রসাধন ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছেন। সিন্ডিকেট করে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের প্রসাধন এনে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা প্রসাধন নকল বা ভেজাল করে দোকানে সরবরাহ করছেন। মানুষ না জেনে, না বুঝে ত্বকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এসব পণ্য ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রসাধনের বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের তদারকি নেই। ফলে নকল প্রসাধনের ব্যবহার বাড়ছেই, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
শীত এলেই প্রসাধনের চাহিদা বাড়ে। পার্লারগুলোয় প্রসাধনের বহুবিধ ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ত্বকের যত্নে বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনের ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি অসাধু চক্রও সক্রিয় রয়েছে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করতে। এ ছাড়া ডলারের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে অনেক ব্যবসায়ী শীতের প্রসাধনের দাম বেশি বাড়িয়ে বিক্রি করছে।
মানসম্মত প্রসাধন বলতে একসময়ে বিদেশি পণ্য বোঝাত। এখন দিন পাল্টেছে। প্রসাধন উৎপাদনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে প্রবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিকমানের প্রসাধন পণ্য উৎপাদনের হাব। অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রসাধন পণ্য এখন ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি হচ্ছে।
প্রতিনিয়তই গোপনে যেকোনো ব্র্যান্ডের পণ্য নিত্যনতুন উপায়ে নকল হচ্ছে। আর এসব পণ্যের শতভাগ ভেজাল হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এতে করে প্রসাধন ব্যবহারকারীদের আস্থাসংকটে লোকসান গুনতে হচ্ছে সৎ উদ্যোক্তাদের। এ ছাড়া বিনা মূল্যে বিমান টিকিটের লোভ দেখিয়ে প্রবাসীদের দিয়ে অবৈধভাবে নকল প্রসাধন পণ্য দেশে আমদানি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে একাধিক অসাধু চক্র জড়িত। শুধু তাই নয়, তারা এ কাজে অসহায় প্রবাসীদের জিম্মি পর্যন্ত করছে। এসব কাণ্ডে দু-একজন ধরা পড়লেও মূল হোতারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থাকছে। এদের ধরতে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রসাধনশিল্প দেশের সম্ভাবনাময় খাত হলেও চোরাইপথে নিম্নমানের পণ্য অবাধে আসায় দেশি শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তথ্য মতে, দেশে প্রসাধনশিল্পের ৩৪ হাজার কোটি টাকার বাজার আছে। দেশে প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকার প্রসাধন আমদানি হয়। আমদানি করা এসব পণ্য অধিক মূল্যে আনা হলেও শুল্কায়নের সময় কম মূল্য দেখানো হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। রাজস্ব ফাঁকির এই অর্থ বিদেশে পাচার করা হয় হুন্ডি বা অন্য কোনো মাধ্যমে। তাই পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের শুল্ক হ্রাস, বিদেশি পণ্য আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি, অবৈধ পথে বাজারে আসার পণ্য ঠেকানো, নকল পণ্য রোধ ইত্যাদি বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ নিলে দেশি প্রসাধনশিল্প বিকশিত হবে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক সমস্যা। এখানে সরকারের তেমন কিছু করার না থাকলেও নজরদারি বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের থামাতে পারে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। আবার ভেজাল প্রসাধন সামগ্রী বিক্রিও কমবে।’
শুল্ক অব্যাহতি ছাড়াও উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকারি নীতি সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে, আমদানি পণ্যে বিএসটিআই-এর ছাড়পত্র পাওয়া যায় মাত্র তিন থেকে পাঁচ দিনে। বিপরীতে স্থানীয় পর্যায়ে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করতে ন্যূনতম সময় লাগে তিন মাসের বেশি। এতে জনবল, বিনিয়োগ এবং সময় বেশি ব্যয় হওয়ায় আমদানি পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের। নকল ও ভেজালমুক্ত পণ্যের ব্যবহাররোধে জনসচেতনতার পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে। ভেজাল প্রসাধন তৈরিতে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।