চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা আর বৈশ্বিক সংকটে দেশের অর্থনীতি অনেকটাই নাজুক হয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েনি বরং ঘুরে দাঁড়িয়েছে অনেকটা। বলা চলে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজস্ব আহরণে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তা মন্দ নয়। সংকটের মধ্যেও রাজস্ব আদায় চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে, অর্থাৎ (জুলাই-নভেম্বর) রাজস্ব আহরণ বেড়েছে বা প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। সে হিসাবে গতবারের চেয়ে গতি কিছুটা বেড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আদায় হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ আলোচ্য অর্থবছরের পাঁচ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে আছে বা ঘাটতি হয়েছে ১৬ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। অর্থনীতির সঙ্গে রাজস্ব আহরণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ১ শতাংশ বাড়লে রাজস্ব বাড়ে ৪ শতাংশ হারে। এ জন্য অর্থনীতির দুরবস্থা হলে রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণের দিক থেকে এনবিআর প্রথাগতভাবে সব সময়ই পিছিয়ে আছে। এটা নতুন কিছু নয়। তবে এ বছরের শুরুতে ঘাটতি যেভাবে বাড়ছে তাতে উদ্বেগটাও বাড়ছে। কারণ নির্বাচনের বছর সরকারি ব্যয় বাড়ে। আয় যদি ভালো না থাকে সরকারের ঋণ বাড়বে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
ভ্যাট কর্মকর্তারা বলেন, ‘অর্থনীতির সংকট আর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিকে অবশ্যই ভালো বলতে হবে। হরতাল-অবরোধের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। আর অর্থনীতি গতিহীন হলে রাজস্ব আহরণে বিরূপ প্রভাব পড়ে। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙা থাকলে ভ্যাট আদায় বাড়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এতে ভ্যাট আহরণে প্রভাব পড়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ আদায় হয়েছে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক খাতে। এখানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর ঘাটতি ৫ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে আমদানি শুল্ক বেড়েছে বা প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। এ খাতেও আদায় মোটামুটি ভালো। জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। যেখানে গত বছরে একই সময় প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। আলোচ্য অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে মোট আদায় হয়েছে ৫১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। ফলে এই সময়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা।
এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, দেশের জিডিপির যে আকার তাতে রাজস্ব আদায় হওয়ার দরকার বছরে কমপক্ষে ৫ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু এনবিআর যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে থাকে, তাতে কমপক্ষে ২ লাখ কোটি টাকা কম আদায় হয়। অর্থাৎ আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক- এই তিন খাতে বছরে ২ লাখ কোটি টাকা ফাঁকি হয়। এই টাকার বড় একটি অংশ আমদানি-রপ্তানির আড়ালে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে মত দেন তিনি। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিবিড় তদারকিসহ সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেটা সঠিকভাবে অর্জন করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই।