দিন দিন সংক্রামক রোগ যেমন বাড়ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অসংক্রামক রোগও। হাসপাতালগুলোয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসংক্রামক রোগীর ভিড়ে ডাক্তাররা সঠিক সেবা দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন। ঘরে ঘরে তিন ধরনের রোগ এখন নিত্যসঙ্গী। এমন কোনো পরিবার নেই যে ডায়াবেটিস, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী খুঁজে পাওয়া যাবে না। মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের ওষুধ কেনা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সরকারের সর্বশেষ জরিপেও উঠে এসেছে এমন তথ্য, যা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে জনস্বাস্থ্যবিদদের। কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হতে পারে। দেশে চিকিৎসার উন্নতি, ওষুধশিল্পের বিস্তার,
স্বাস্থ্যসচেতনতার অগ্রগতির বিপরীতে অসংক্রামক রোগের বিস্তার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
বিবিএসের তথ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ গ্যাস্ট্রিক-আলসার, ১৩ শতাংশ উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপ, ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ বাত বা আরথ্রাইটিস, ৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ শ্বাসজনিত সমস্যা, ৮ দশমিক ২৪ শতাংশের ডায়াবেটিস ও ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ হৃদরোগে আক্রান্ত। বাকি ২৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ অন্যান্য ক্যাটাগরির রোগ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি বড় রোগগুলোর মধ্যে গ্যাস্ট্রিক-আলসারের প্রকোপ শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি। নারীদের চেয়ে পুরুষ বেশি আক্রান্ত। হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের মধ্যে নারী বেশি। শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের মধ্যে পুরুষই বেশি। আরথ্রাইটিসে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নারীরা। ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে নারী-পুরুষের হার প্রায় কাছাকাছি। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার গ্রামের চেয়ে শহরে দ্বিগুণ।
আমাদের দেশে সংক্রামক ও অসংক্রামক দুই ধরনের ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের চাপ সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়েছে। আজকাল শিশুরা ঘরে তৈরি খাবারের পরিবর্তে বাইরের খাবার বা ফাস্টফুডের দিকে অধিকমাত্রায় ঝুঁকছে। শিশুকাল থেকেই একটা মানুষের আচরণগত পরিবর্তন হচ্ছে বিভিন্নভাবে। বেশি রাত করে ঘুমানো এবং দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা বর্তমান প্রজন্মের নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অল্প বয়সে স্থূল হওয়ার কারণে রোগাক্রান্তের হারও বাড়ছে। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চিন্তার চেয়ে রোগ যাতে না হয়, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে হাসপাতালের সংখ্যা বাড়লেও রোগীর মৃত্যু ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি ১৮ ক্যাটাগরির রোগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে জনসংখ্যার শতকরা হারে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয়টি ক্যাটাগরির রোগের হার ৭০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাকি ২৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত। দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই অসংক্রামক রোগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই ছয় রোগে রীতিমতো কাবু হয়ে পড়ছে দেশের বেশির ভাগ মানুষ। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের কর্মসংস্থান ও উপার্জনের ক্ষেত্রে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। সংক্রামক রোগ ঠেকানো এখন কঠিন নয়। কিন্তু অসংক্রামক রোগ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে মানুষের মধ্যে অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসার পরিসরও বাড়ানো হচ্ছে। নতুন বছরে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত কর্নার চালু হচ্ছে।
রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। রোগ ঠেকানোর পদক্ষেপ নিলে এর বিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। সবার আগে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সুস্বাস্থ্যের জন্য শারীরিক পরিশ্রমের বিকল্প নেই। সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আরও দূরদর্শী ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলেই দেশের মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। এ ব্যাপারে সরকার নিশ্চয়ই যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।