গ্যাস সরবরাহ গত চার বছরের মধ্যে এখন সর্বনিম্নে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলেছেন, গ্যাসের সংকট আগে কখনো এমন হয়নি। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র গ্যাসসংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাসনির্ভর বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শুধু শিল্পোৎপাদনই নয়, গ্যাসের অভাবে রাজধানীর অনেক এলাকায় চুলায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো স্থানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাস থাকছে না। গৃহিণীরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। অন্যাদিকে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিল্পোৎপাদন। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। কোনো প্রতিকার না পেয়ের হতাশ শিল্পোদ্যোক্তারা। শিল্পমালিকরা বলছেন, চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছেন তারা। এভাবে চলতে থাকলে ফ্যাক্টরি লে-অফ ঘোষণা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ২৫০ কোটি ঘনফুট। অথচ চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। শিল্প ও গৃহস্থালি কাজে সংকট দেখা দিয়েছে সে জন্য। গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। স্থানীয় গ্যাসফিল্ড কোম্পানিগুলোর উৎপাদন কমে গেছে। এ জন্য সরবরাহে ঘাটতি হয়েছে।
গ্যাসনির্ভর শিল্প খাতের মধ্যে গ্যাস সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সিরামিক, টেক্সটাইল, ইস্পাত রি-রোলিং মিল, ডাইং-ফিনিশিং কারখানায়। শিল্পমালিকরা জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্যাসের চাপ যে পরিমাণ থাকে, তা দিয়ে কারখানা চালানো যায় না। ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
গ্যাসের অভাবে টেক্সটাইল খাতের উৎপাদন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। স্পিনিং শিল্পেও একই অবস্থা। এমন খারাপ অবস্থা আগে কখনো দেখা যায়নি। টেক্সটাইল খাতের প্রবৃদ্ধি এবং সম্ভাবনায় দেশে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। অনেকেই শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তাদের এ বিনিয়োগ কোনো কাজে আসছে না। কারণ গ্যাসের অভাবে আগের কারখানাগুলো উৎপাদন-সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। নতুন বিনিয়োগের কারখানা অলস পড়ে রয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ আসে মূলত দুটি উৎস থেকে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন এবং বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি। বৈদেশিক মুদ্রা ডলার সাশ্রয়ে গত বছর খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ করে দেয় সরকার। জুলাই থেকে পরবর্তী সাত মাস এটি বন্ধ থাকে। এরপর গত বছরের জানুয়ারিতে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে ফেব্রুয়ারি থেকে কেনা শুরু করে আবার। তবে শিল্প খাতে বাড়ানো হয় ১৭৯ শতাংশ। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের শর্তে এটি মেনে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বেশি দাম দিয়েও এখন গ্যাসের কারখানা চালানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন তারা।
গ্যাসের অভাবে রাজধানীবাসী নিদারুণ কষ্টে আছেন। এক থেকে দেড় মাস ধরে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় এক মাস ধরে চুলা জ্বলছে না। হোটেলই একমাত্র ভরসা। রান্নার কাজে অনেকেই এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় স্বল্প আয়ের লোকজন বিপাকে পড়েছেন। রাজধানীর অনেক পরিবার আছে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা মাটির চুলা ব্যবহার করছে। জ্বালানি কাঠ দিয়ে রান্নার কাজ করছে। রাজধানীর প্রায় সব এলাকায়ই কমবেশি গ্যাসসংকট চলছে।
তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) প্রকৌশলী মো. সেলিম মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে গ্যাসের চাপ কম। এ জন্য সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। চাপ কম থাকায় সব জায়গায় গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিগগিরই গ্যাস পাইপলাইনে এলএনজি সরবরাহ শুরু হবে, তখন চাপ বাড়বে। ফলে সমস্যা আর থাকবে না।’
গ্যাস পাইপলাইনে এনএনজি সরবরাহ বাড়াতে হবে। এমনিতেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলারসংকট তো চলছেই। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস আমদানি করাটাও কঠিন। তাই গ্যাসের সংকট দূর করতে হলে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অবিষ্কার, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার- এগুলোর ওপর সরকারকে নজর দিতে হবে।