বাসাবাড়িতে গ্যাসের লাইন আছে। আবার গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাসও কিনতে হচ্ছে। গ্রাহকদের সরকারনির্বারিত ১ হাজার ৮০ টাকা বিল দিতে হচ্ছে। ফলে খরচের খাতায় অতিরিক্ত টানাপোড়েন চলছে তাদের। কেউ কেউ ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজধানীতে শীতে বাসাবাড়িতে গ্যাসসংকট থাকলেও বহু এলাকায় সারা বছরই পিক টাইমে গ্যাস পাওয়া যায় না। অথবা চুলা মিটমিট করে জ্বলে। অনেককে বাধ্য হয়ে রাত জেগে রান্না করতে হয়। গ্যাস না পাওয়া সত্ত্বেও বিল দেওয়ার বিষয়টি নৈতিকতার দিক দিয়ে কতটা সঠিক, বিষয়টি নিয়ে যখন গ্রাহকরা প্রশ্ন তুলছেন, তখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘অচিরেই আমরা বাসাবাড়িতে মিটার লাগিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেব। বাসাবাড়িতে ২০ থেকে ২৫ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। তাদের আমরা পর্যায়ক্রমে মিটারের মধ্যে দিয়ে আসব। ৪ লাখ গ্যাসের মিটার ইতোমধ্যে লাগানো হয়েছে।’
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। তারা জানান, সারা বছরই গ্যাসের সংকট। সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং গ্যাসের বিলও দিতে হচ্ছে। এটা কতটা নৈতিক, তা সরকারকে ভেবে দেখার অনুরোধ করেন তারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সারা বছরই গ্যাসের চাপ কম থাকে। এসব এলাকায় শীতকালে একেবারেই গ্যাস পাওয়া যায় না। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গড়ে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবাদী হওয়া ছাড়া এই চক্র থেকে বোরোনোর উপায় নেই। জনপ্রতিনিধিদের যে ভূমিকা অতীতে দেখা যেত, এখন তেমনটা দেখা যায় না। বাসাবাড়িতে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এটা অনৈতিক। এই ইস্যুটির বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিদের সোচ্চার হতে হবে।’
গ্যাসসংকটের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু চক্র এলপিজির ক্ষেত্রেও নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। প্রতি মাসের প্রথম দিকেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। কিন্তু কখনোই সরকারনির্ধারিত সেই দামে এলপিজি বিক্রি হয় না। সিলিন্ডারপ্রতি ভোক্তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। এভাবে মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ভোক্তার কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে এলপিজি সিন্ডিকেট।
বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডার থাকলেও মূলত চাহিদা রয়েছে ১২ কেজির সিলিন্ডারের। জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া আছে ১ হাজার ৪৩৩ টাকা। কিন্তু দেখা গেছে, ভোক্তার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি পর্যবেক্ষণ বলছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এলপিজির চাহিদা ৯০ লাখের বেশি। সেই হিসাবে প্রতিটি সিলিন্ডার থেকে যদি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি নেওয়া হয়, তাহলে গড়ে মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে গ্রাহকের পকেট থেকে।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারনির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। ভোক্তা অধিকার মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও তেমন সুফল মিলছে না। পরস্পরকে দোষারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা। খুচরা বিক্রেতারা দোষারোপ করছেন ডিলারদের। ডিলাররা দোষারোপ করছেন বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। আর বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুষছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি)। কিন্তু এই ফাঁকে লুটপাটের শিকার হচ্ছেন ভোক্তারা। মামলার ভয়ে নাম প্রকাশেও ভয় পাচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা। বর্তমানে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ভরার ব্যবসা করছে মোট ২৮টি কোম্পানি। এসব কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের দাবি, বিইআরসির দাম নির্ধারণ ফর্মুলা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবহনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচ সমন্বয় করা হয় না এতে। তারা বলছেন, বাজার অস্থিতিশীল কোনোভাবেই হতো না যদি বিইআরসি ও অপারেটরদের সমন্বয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের রিয়াল মার্জিনটা তুলে ধরা হতো। প্রাইসিং ফর্মুলা অ্যাকিউরেট করতে হবে। না হলে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলাররা সার্ভাইভ করতে গিয়ে দাম বাড়াবেই।
একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সংকটকে পুঁজি করে গ্যাসের নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। একদিকে গ্যাসের সরকারি বিল প্রদান করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বেশি দামে এলপিজি গ্যাসও কিনতে হচ্ছে- এটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। গ্যাস অবশ্যই সরকারনির্ধারিত দামে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করতে হবে। ভোক্তাদের পকেট কাটছে প্রতিনিয়ত সিন্ডিকেট চক্র। সুতরাং সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকার গ্যাসসংকটের সমাধান করবে, এটাই প্রত্যাশা।