গত কয়েক বছর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল। কিন্তু সরকারের এই ঘোষণাকে কার্যকর রূপ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। উপরন্তু দুর্নীতির ব্যাপকতা ঘনীভূত ও বিস্তৃত হয়েছে। সরকারি ক্রয় ও বিতরণব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে দুর্নীতির অসংখ্য তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই সময়কালে বিদেশে অর্থ পাচারের আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এলেও এর প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। এবার বাংলাদেশের অবস্থান দশম, যা গতবার ছিল দ্বাদশ। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এটি গত এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সূচকে সবচেয়ে কম ১১ স্কোর পেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সোমালিয়া। জার্মানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) ২০২৩ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ঋণখেলাপি, জালিয়াতি ও অর্থ পাচারে জর্জরিত ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এ জন্য যারা দায়ী, তাদের জন্য বিচারহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমনে কার্যকর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে অর্জিত ক্ষমতার অবস্থানকে অপব্যবহারের মাধ্যমে সম্পদ বিকাশের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপকতা বেড়ে স্বাভাবিকতায় রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব ব্যাপকতর হয়েছে।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। প্রথম অবস্থানে আফগানিস্তান, তৃতীয় পাকিস্তান, চতুর্থ শ্রীলঙ্কা, পঞ্চম নেপাল, ষষ্ঠ ভারত ও মালদ্বীপ এবং সপ্তমে ভুটান।
সূচকে দুর্নীতির ১০টি ধরন ও বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো ঘুষ ও সরকারি তহবিল তছরুপ, সরকারি চাকরির নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত লাভের জন্য কর্মকর্তাদের সরকারি অফিসের অবাধ ব্যবহার, সরকারি কর্মকর্তাদের আর্থিক এবং সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকাশের আইনি বাধ্যবাধকতা, সরকারি কাজে অতিরিক্ত লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, যা দুর্নীতির সুযোগ বৃদ্ধি করে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলয়ে কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দখলদারি, দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলার কার্যকর বিচার, সরকারি খাতে দুর্নীতি দমনে অক্ষমতা, ঘুষ ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারীদের আইনি সুরক্ষা এবং জনসংশ্লিষ্ট কিংবা সরকারি কর্মকাণ্ডে তথ্যের অভিগম্যতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে সব সরকারই দুর্নীতি প্রতিরোধে ইতিবাচক অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না, যা খুবই নেতিবাচক। তাই সরকারের অঙ্গীকারে সততা ছাড়া দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিষয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সরকারি নীতিনির্ধারক ও কর্তাব্যক্তিদের প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্যে দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে মনে করেন তারা। নবগঠিত সরকার পুনরায় দুর্নীতি প্রতিরোধে যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সিপিআই (দুর্নীতির ধারণা সূচক) অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান হতাশাজনক। সূচকের বিশ্লেষণ করলে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থান গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন। স্কোর ও অবস্থানের এই অবনমন প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন অঙ্গীকার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা বাস্তবিক অর্থে কার্যকর প্রয়োগ হয়নি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি আরও জোরদার করার সময় এসেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ও স্কোর নিয়ে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দেশে চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সেই সঙ্গে কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রতিটি সেক্টরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে সুশাসন ফিরিয়ে আনাই এখন নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রত্যাশা করছি, সরকার সে দিকটায় সফল হবে।