বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ কৃষির মতো প্রধান পেশা থেকে এখন দূরে সরে যাচ্ছে। সম্প্রতি বিবিএসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বেশ কিছু তথ্য। গ্রাম এলাকায় ৬১ শতাংশ পরিবারের চাল কিনে খেতে হচ্ছে। চাল কিনতে শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষের বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশিত খাদ্যনিরাপত্তা পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। দুটি বিষয়কেই দেশের খাদ্য উৎপাদনে গ্রামীণ ব্যবস্থার বড় পরিবর্তন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়বে বলেও কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
তথ্যমতে, গ্রামের ৬১ শতাংশ পরিবারই চাল কিনে খায়। চাল কিনতেই তাদের মাসিক খরচ ২ হাজার ৮২২ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় ২ হাজার ২২১ টাকা, শহর অঞ্চলে ২ হাজার ৫৪০ টাকা। গ্রামে কৃষিকাজ অনেক কমেছে। কৃষিকাজ কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণও রয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এতে তাদের প্রচুর সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়। সে অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য পান না। সার, কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি; ফসল ওঠার পর লোকসানের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়, যেমন ফসল কাটা, জমি পরিষ্কার করা, মাড়াই করা, শুকানো, বাজার খুঁজে বিক্রি করা খুব ঝামেলা। এতে অনেক জমি অনাবাদিও থাকে। গ্রামে এখন ধান চাষ জটিল হয়ে পড়েছে। জমি বর্গা দিয়ে দিয়েছেন মালিকরা। এখান থেকে যে অর্থ পাচ্ছেন তা দিয়েই চাল ক্রয় করছেন তারা। তারা তুলনামূলক দামি ও সরু চাল কেনার দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় উৎপাদিত চাল তারা খুব একটা পছন্দ করছেন না। স্থানীয় কৃষক যারা নিজেরা নিজেদের জমি চাষ করেন তারা কিছু পরিমাণ চাল মজুত রাখেন। আবার অনেকে নিজেদের উৎপাদিত ধান মজুত রাখতে ঝামেলা মনে করেন। ফলে বেশির ভাগই উৎপাদিত ধান পুরোটা জমি থেকে সরাসরি চাতাল বা মিলে বিক্রি করে দেন।
খাদ্যনিরাপত্তা পরিসংখ্যানের ব্যয় তথ্য বিশ্লেষণে পরিবারের চালের প্রধান উৎস এবং বর্তমানে কত দিনের মজুত এবং সাধারণত কত দিনের মজুত থাকে, তার একটি বিন্যাস দেখানো হয়েছে। দেখা যায়, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ৬৮.৭ শতাংশ পরিবারে ক্রয়কে তারা তাদের বর্তমানে মজুত রাখা চালের প্রধান উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার পর নিজস্ব ব্যবহারের জন্য উৎপাদন এবং সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন যথাক্রমে ২৮.০ ও ১.৩ শতাংশ। যেখানে ২.০ শতাংশ পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য চালের কোনো মজুত থাকে না।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক ড. হাসনিন জাহান খবরের কাগজকে বলেন, গ্রামের নতুন প্রজন্ম কৃষি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে চাষাবাদের জন্য জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে। গ্রামের চাষাবাদ অনেকটাই নারী কর্মী ও করপোরেটনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় দিনমজুর না পাওয়ায় কৃষকরা এখন আর নিজেরা ধান মাড়াই, সেদ্ধ কিংবা ভাঙানোর ঝামেলায় যেতে চান না। তারা সংক্ষেপে জমি থেকে ধান চাতালে বিক্রি করে দেন। এটা ভালো কোনো লক্ষণ নয়। তাই নতুন প্রজন্মকে কৃষির প্রতি আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নিতে হবে।
কৃষিপ্রধান দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে না পারলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য পাঠ্যপুস্তকে কৃষিবিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এক টুকরা জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে, সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে স্বনির্ভর জাতি হিসেবে গড়ে তোলার সময় এসেছে। জল, জমি, জনতার দেশ খাদ্য উৎপাদনে থাকবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এটি মাথায় রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে।