'সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’ স্লোগান সামনে রেখে জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বাজেট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৫তম এবং অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর প্রথম। দেশের অর্থনীতি এখন নানা সংকটে। জ্বালানি ও ডলারসংকটে জর্জরিত। মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা সীমিত আয়ের মানুষ। প্রায় দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। জীবনযাত্রার এই দুঃসময় ও সংকট উত্তরণে এই বাজেট নতুন আশার সঞ্চার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে বাজেট মানেই প্রতিবছর ব্যয় বৃদ্ধির খতিয়ান। তাই বাজেট নিয়ে তাদের উৎসাহ কম, বরং আতঙ্কটাই বেশি।
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বাজেট নিয়ে বলেন, ‘বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রাখা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অপরদিকে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এই মুহূর্তে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বড় বিষয় হওয়া উচিত নয়। কিছুটা কম হলেও ক্ষতি নেই।’
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, আয় ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি দেখানো হয়েছে। ঘাটতি ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা; যা দেশের মানুষের জন্য অশনিসংকেত। দ্রব্যমূল্যর ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। ব্যক্তি খাতেও কর ছাড় দেওয়া হয়নি। ফলে জনজীবনে আরও চাপ ও অস্বস্তি বাড়বে। বাজেটে ব্যয়ের মাত্রা বেশি হলে আয়ও বেশি করতে হবে। কিন্তু সেই আয় কোথা থেকে আসবে, তার কোনো উত্তর নেই।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কমাতে যে উদ্যোগ দরকার তা বাজেটে নেই। বাজেটে আয় ও খরচের দিক সামঞ্জস্যহীন। আয় বাড়াবেন না অথচ ব্যয় করবেন। তা হলে তো মূল্যস্ফীতি কমবে না।’
এ বছরের বাজেট গত (২০২৩-২৪) সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। এবার ব্যয় বাড়ছে ৮২ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। বড় অঙ্কের ব্যয় মেটাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৪ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার অর্থসংকটে আছে। দেশের অর্থনীতি চলমান রাখতে অর্থমন্ত্রীর সামনে রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রস্তাবিত বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপের প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রায় পদে পদে খরচ বাড়বে। সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে।
অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি ঠেকাতে বাজেটে নির্দেশনা রাখা হয়নি। অন্যদিকে পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্যান্য খরচ কমানোর স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। সাধারণ মানুষের হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। রাজস্ব আয় বাড়াতে গিয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর কর বসানো হয়েছে। বাড়ানো হবে দেশীয় তৈরি ফ্রিজ ও এসির দাম। ব্যাংকে টাকা রাখলেও খরচ বাড়ছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ঘরে থাকলেও বাড়বে না করমুক্ত আয়সীমা। সমালোচনা এড়াতে ধনী করদাতাদের ওপর করের হার ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করলেও ছাড় দিলেন অতি ধনীদের।
বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ায় অসন্তোষ সষ্টি হয়েছে। শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানও কালোটাকা সাদা করতে পারবে। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা নগদ টাকা ১৫ শতাংশ কর দিয়ে সাদা করা যাবে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংকটে গণমুখী বাজেট হয়েছে, বাস্তবসম্মত হয়েছে। দলের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকার খাত বিবেচনায় নিয়ে বাজেট দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট লুটের নতুন পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ মানুষের ওপর আরও বোঝা চাপাবে।
নতুন বাজেটে অর্থনীতির ক্রান্তিকালীন সংকটের সমাধান নেই বলে মন্তব্য করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। জনগণের প্রত্যাশা ছিল এই বাজেট অনেক উদ্ভাবনী হবে। সৃজনশীল ও কিছু সাহসী পদক্ষেপ থাকবে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ সামান্য বাড়লেও মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের পথ প্রায় বন্ধ। এ দিকটার প্রতি সরকারের নজর দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাসে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখবে হবে।