উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এর ওপর নতুন করে পণ্য ও সেবায় সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতাও চলমান রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ স্থবির হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এটি সর্বোচ্চ। ডলারের দাম ১২৩ টাকার বেশি। কিছুটা ইতিবাচক আছে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে। এদিকে বাড়তি ঋণ পেতে নতুন শর্ত আরোপ করেছে আইএমএফ। তা হলো কর আহরণ আরও বাড়াতে হবে। মূলত আইএমএফের শর্ত পালন করতে গিয়েই অর্থবছরের মাঝপথে এসে প্রায় ১০০ পণ্য ও সেবায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থনীতি যে সংকটে আছে তাতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৬ শতাংশের বেশি। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা কৃষিতে। এ খাতে চলতি প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ।
শিল্প ও সেবা খাতের অবস্থাও শোচনীয়। অবশ্য অর্থনীতির এই নাজুক অবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ৫ আগস্টের পর ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরে অর্থনৈতিক নেতৃত্বেও বড় পরিবর্তন হয়েছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশ নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ঘাড়ে দেশি-বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। এ অঙ্ক বাংলাদেশের তিনটি জাতীয় বাজেটের সমান। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অপরদিকে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বিশাল অঙ্কের এই ঋণের বিপরীতে সরকারকে প্রতিবছর ১ লাখ কোটি টাকার বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। এতে করে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। গত বুধবার ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির বিষয়টি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। এ ছাড়া আরও চারটি বিষয়কে ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। সেগুলো হলো চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া, পরিবেশদূষণ, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক নিম্নমুখিতা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, অর্থনীতিতে অনেক সমস্যা রয়েছে। রিজার্ভের সমস্যা, আমদানি সমস্যা, ব্যাংক খাতের সমস্যা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সুফল মেলেনি। কিছু খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থনীতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য সরকার চেষ্টা করছে। তবে এর সুফল আসবে কি না, তা এখনই বলা মুশকিল।
সরকারের সামনে এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সামষ্টিক অর্থনীতির জায়গাগুলোতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ কাজে লাগাতে পারে সরকার। বাজেট যাতে মাথা ভারী ও বিলাসী না হয়, সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে। প্রত্যাশা করছি, সরকার অচিরেই সব সমস্যার সমাধান করে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।