প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের এই সফরের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের আগমন উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মহাসচিবের এই সফরের মধ্য দিয়ে ঝিমিয়ে পড়া রোহিঙ্গা ইস্যুটি ফের আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণে সুযোগ সৃষ্টি হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এটি একটি বড় উদ্যোগ বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে। এ সময়টা জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা সংকটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করবেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের সফরের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গুতেরেসের ঢাকা সফর এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন এই সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এ বছর জাতিসংঘের উদ্যোগে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে মায়ানমার সরকারের নির্যাতন ও অত্যাচারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা।
ওই সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে, তা আন্তর্জাতিক মহলকে ব্যাপক নাড়া দেয়। সে সময় রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীন উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চীনের মধ্যস্থতার উদ্যোগ সফল হয়নি। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলছেন, রোহিঙ্গারা যেন মর্যাদার সঙ্গে এবং স্বেচ্ছায় মায়ানমারে প্রত্যাবাসন করতে পারে, সে জন্য বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের বাংলাদেশ সফরকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির খবরের কাগজকে বলেন, তার এই সফর তিনটি দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও নির্বাচন-প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে একটি ধারণা পাবেন মহাসচিব। চাইলে সরকারের এই উদ্যোগে সমর্থন ও কারিগরি সহায়তা দিতে পারে জাতিসংঘ। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র সরকার রোহিঙ্গাদের যে মানবিক সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে, সেই ঘাটতি পূরণে মহাসচিবের সহযোগিতা চাইতে পারে বাংলাদেশ। কেননা, একমাত্র তিনিই পারেন এই ঘাটতি মেটাতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করতে। তৃতীয়ত, রাখাইনে এখন দুর্ভিক্ষ চলছে। সেখান থেকে এখনো রোহিঙ্গা আসছে। তাই রাখাইনে জাতিসংঘ মানবিক সহায়তা দিতে পারে কি না, যাতে রোহিঙ্গারা আর না আসে।
এ বিষয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে বাংলাদেশ সরকার। রোহিঙ্গা ইস্যুটি দেশের দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত সমস্যা।
বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে এত বড় বোঝা বহন করা কঠিন। বিষয়টি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উন্নত দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কাছে তুলে ধরা হলেও এ সংকট সমাধানে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাদের আর্থিক সহায়তার জন্য দাতা সংস্থাগুলো থেকে যে সাহায্য পাওয়া গিয়েছিল, তাও অপ্রতুল। বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে মায়ানমার সরকারকে প্রত্যাবাসন-প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার জন্য জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আশা করি। আমরা মনে করি, জাতিসংঘ মহাসচিবের এই সফরের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের পথ উন্মোচিত হবে।