ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে শঙ্কার মধ্যেও গত ২২ মার্চ পালিত হলো বিশ্ব পানি দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘হিমবাহের সুরক্ষা’। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এর স্তর দিন দিন অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে দেশে দিন দিন পরিবেশগত সংকট বেড়েই চলেছে এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার না বাড়ালে পানি উত্তোলন অতি ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। এ ছাড়া পানিতে আর্সেনিকসহ অন্যান্য দূষণ বাড়তে পারে।
এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রাকৃতিক পরিবেশও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। উত্তরের জনপদের মতো এ দশা দেশের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্রমেই ফাঁকা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ স্তর। ২০২২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪৬৫টি অগভীর ভূগর্ভস্থ পানি পর্যবেক্ষণ কূপের ৪০ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। উপাত্ত বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, পানির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে এক থেকে তিন মিটার পর্যন্ত পানির স্তর নেমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভ থেকে পানি কেবল উঠছে, সেই সঙ্গে মাটির তল শুধু ফাঁকা হচ্ছে। দেশের শহরাঞ্চলে নিত্য ব্যবহৃত কাজে, শিল্পে ও গ্রামাঞ্চলে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির বেশি ব্যবহার হচ্ছে। যথাযথ পরিকল্পনা করে পানি উত্তোলন ও ব্যবহার না করায় এর অপচয় বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা ওয়াসা। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট সরবরাহের ৬৭ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমার লক্ষণও নেই। পানি বিশেষজ্ঞসহ পরিবেশবাদীরাও এটা মানছেন। কিন্তু সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় মিঠা পানি সমৃদ্ধ বাংলাদেশেও সুপেয় পানি দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকার মানুষ সুপেয় বা নিরাপদ পানির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬। এর মধ্যে ৫৯ ভাগ অর্থাৎ ৯ কোটি ৭৪ লাখ ৪৩ হাজার ২২০ মানুষ সুপেয় পানি সুবিধার আওতায় এসেছে। আর সুপেয় পানি সুবিধার বাইরে রয়েছে ৪১ ভাগ অর্থাৎ ৬ কোটি ৭৭ লাখ ১৪ হাজার ৭৮০ মানুষ। এখনো দেশের ১০ ভাগ মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। অর্থাৎ নিরাপদ পানি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে অনেক মানুষ।
স্বাভাবিক অবস্থায় মাটির ছয় থেকে সাত ফুট নিচেই ভূগর্ভস্থ উৎসে পানি থাকার কথা। কিন্তু চিত্র এখন উল্টো। খুলনায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে ২৫ থেকে ৩০ ফুট। রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলে ১২০ থেকে ১৪০ ফুট নিচে নেমেছে। বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক থাকলেও খরা মৌসুমে এটি স্বাভাবিক থাকে না। তবে দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে খরা এবং বর্ষা উভয় মৌসুমেও অবস্থা একই থাকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কিছু সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কৃত্রিমভাবে বর্ষার মৌসুমে পানি নিচে প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে যাতে করে দেশ ভয়াবহ পানিসংকট থেকে মুক্ত থাকতে পারে।