আজ ২৫ মার্চ, ভয়াল রাতের সেই স্মৃতিবাহী দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মধ্যরাত পেরিয়ে পাকিস্তানি সশস্ত্র সেনারা মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর সেই গণহত্যা চলে পুরো ৯ মাস। অকুতোভয় অসমসাহসী বাঙালিরাও শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ। ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা।
পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সূচনা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে। নির্বিচারে তারা নিরীহ বাঙালি বেসামরিক মানুষের ওপর গণহত্যা শুরু করে। লক্ষ্য ছিল বাঙালি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সচেতন নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করে বাঙালিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমন আর বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করা। এই অভিযানের সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন পাকিস্তানের দুজন সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। কোনো লিখিত নির্দেশ নয়, তারা মুখে মুখে বিভিন্ন কমান্ডার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাতেন। ২০১২ সালে মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ নামে যে আত্মজীবনী প্রকাশ করেন, তাতে প্রথমবারের মতো অপারেশন সার্চলাইট সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়। পাকিস্তান সরকার প্রণীত শ্বেতপত্রেও এই অভিযানের ভয়াবহতা সম্পর্কে উল্লেখ আছে, ‘১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত ১ লাখের বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।’ পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র এক রাতে অর্থাৎ ২৫ মার্চ যে গণহত্যা হয়েছিল, অন্য কোথাও এমনটা ঘটেনি।
২৫ মার্চের মধ্যরাতে পিলখানা, রাজারবাগ, নীলক্ষেত আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনারা। ট্যাংক ও মর্টারের মাধ্যমে নীলক্ষেতসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখলে নেয়। সেনাদের মেশিনগানের গুলিতে, ট্যাংক-মর্টারের গোলায়, আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর সেই রাতটি হয়ে ওঠে বিভীষিকাময় রাত। অনেক পরে পাকিস্তানি জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সামরিক কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। এমন আঘাত হানার নির্ধারিত মুহূর্ত (এইচ-আওয়ার) পর্যন্ত স্থির থাকার চিহ্ন বিলুপ্ত হয়ে গেল। নরকের দরজা উন্মুক্ত হয়ে গেল।’
সে রাতে সেনা অভিযানের শুরুতেই হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের আগে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ (২৫ মার্চ মধ্যরাতে) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আহ্বান জানান, যেকোনো মূল্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার। তার পরের ইতিহাস তো মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। কিন্তু ২৫ মার্চের নারকীয় ইতিহাসের কথা বাঙালি হিসেবে ভুলবার নয়।
আজ আবার ফিরে এসেছে ভয়াল স্মৃতির সেই ৫৫তম রাত। এখন নতুন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। সেদিন যারা দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন, তাদের রক্তের ঋণ আমাদের নতুন এক উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সন্ধান দিক, তাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। একাত্তরের ২৫ মার্চের রাতে জীবন উৎসর্গ করা সব শহিদের কথা স্মরণ করে তাদের স্মৃতির প্রতি আমরা সশ্রদ্ধচিত্তে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।