মাগুরায় ৮ বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় তুললেও থেমে নেই শিশু ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতনসহ শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। এ অবস্থায় শিশু অধিকার কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠছে।
তারা বলছেন, শিশুদের অধিকার রক্ষায় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন শিশুবিষয়ক আলাদা অধিদপ্তর। অন্যদিকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলে আসছে শিশু একাডেমিই হবে শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে তা কবে, কত দিনের মধ্যে হবে সে বিষয়ে নেই কোনো অগ্রগতি।
মহিলা পরিষদের গত এপ্রিল মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এ মাসে কেবল ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬৪ শিশু। অন্যদিকে এ সময়ে নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৬ জন। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৬ কন্যাশিশু ও ৮ জন নারী। ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ২২ কন্যাশিশুকে। আর ৭ জন নারীর ওপর একই চেষ্টা হয়েছে। অর্থাৎ এসব পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের তুলনায় শিশুরা অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দুর্বল হওয়ায় তাদের ওপর চলে নানাভাবে নির্যাতন। আর শিশুর সঙ্গে হওয়া এসব অন্যায়ের বিচারও ঠিকঠাক পাওয়া যায় না বলে দাবি শিশু অধিকার কর্মীদের। তারা বলছেন, আজকের শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ। সুতরাং তাদের সঠিক বিকাশের ওপরই নির্ভর করে এদেশের ভবিষ্যৎ। এ ছাড়া দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই যখন শিশু তখন তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা ও জবাবদিহির জন্য একটি আলাদা অধিদপ্তর অত্যন্ত প্রয়োজন। ২০১৬ সালে তৎকালীন সরকার এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও ৯ বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম অ্যান্ড প্ল্যানিং) জাহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের যে প্রেক্ষাপট যেখানে কি না ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু সে হিসেবে কিন্তু এদেশের ৪০ শতাংশেরও বেশি জনসংখ্যা শিশু। অথচ আমরা যখন কোনো পরিকল্পনা করি তখন এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কথা বলার মতো কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। আমাদের যে মন্ত্রণালয়টি রয়েছে সেটি হচ্ছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর অধীনে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরও রয়েছে আলাদা করে। কিন্তু শিশুদের জন্য আলাদা করে কোনো অধিদপ্তর নেই। ফলে শিশুদের নিয়ে আইন, শিশুদের সুবিধা-অসুবিধা, এমনকি শিশুদের জন্য যে বাজেট বরাদ্দ হয় সেখানে শিশুদের কী প্রয়োজন বা তাদের চাওয়াটা কী সেটি জানার এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তা পৌঁছে দেওয়ার কেউ নেই। এ ছাড়া মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরসহ এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভাগ, জেলা, থানা এমনকি প্রান্তিক পর্যায়ে অবকাঠামো ও লোকবল রয়েছে। যারা নারীদের যেকোনো সুবিধা-অসুবিধাগুলোর দেখভাল করেন এবং কোনো গুরুতর সমস্যা হলে তাদের কাছে যাওয়া যায়। কিন্তু শিশুদের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। শিশু একাডেমি যে জায়গাগুলোতে আছে সেখানে একজন করে শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা আছেন। কিন্তু শিশু একাডেমি যেহেতু শিশুদের বিকাশের বিশেষভাবে সংস্কৃতির দিকটি নিয়ে কাজ করেন, তাই তারা শিশুদের অধিকার হননের কোনো ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন না। ফলে শিশুদের জন্য যে বাজেট দেওয়া হয় সেটি ঠিকঠাক শিশুদের জন্য ব্যয় হচ্ছে কি না এটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। কোনো জনবল নেই, নেই জবাবদিহিও। এ কারণে শিশুদের জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয় না হোক, একটি আলাদা শিশু অধিদপ্তর অন্তত হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘সমাজসেবা এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশুদের জন্য অনেক প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু এই দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এক মন্ত্রণালয় জানে না আরেক মন্ত্রণালয় কী করছে। ফলে শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী কী পদক্ষেপ নিতে হবে সে বিষয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। অনেক সময় দেখা যায়, বাজেট বরাদ্দ আছে কিন্তু তা শিশুদের যে বিষয়টিতে বেশি প্রয়োজন সেটিতে বরাদ্দ করা হয়নি। কারণ এই দুই মন্ত্রণালয়ে এমন কেউ নেই যিনি শিশুদের বিষয়টি সামগ্রিকভাবে দেখে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা দেবেন। এ ছাড়া যে শিশু আইনটি রয়েছে সেটিও সমাজসেবার অধীনে। ফলে শিশুর অধিকার হরণের কোনো ঘটনায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। অন্যদিকে সমাজসেবায় নির্দিষ্ট কেউ শুধু শিশুদের জন্য নিয়োজিত না থাকায় ওই বিষয় বা অভিযোগগুলো অবহেলিতই থেকে যায়।’
সেভ দ্য চিলড্রেন-এর চাইল্ড প্রোটেকশন অ্যান্ড চাইল্ড রাইটস গভর্ন্যান্স বিভাগের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুদের অধিকার রক্ষায় শিশুবিষয়ক আলাদা একটি অধিদপ্তর করার দাবি আমাদের অনেক দিনের। এ বিষয় নিয়ে কাজ চলমান আছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আমাদের সহায়তায় একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তাদের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। গত বছর মিটিং হয়েছিল এই কমিটির কিন্তু এ বছর চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো মিটিং হয়নি। ফলে বোঝাই যায় এটি কত ধীরগতিতে চলছে।’
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন অধিশাখা) মো. ফিরোজ উদ্দিন খলিফা খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুবিষয়ক অধিদপ্তরের বিষয়ে আমি যত দূর জানি কাজ চলমান আছে। শিশু একাডেমিকে শিশু অধিদপ্তরে রূপান্তর করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তবে শিশু একাডেমির বর্তমান যে কার্যক্রম সেটিও থাকবে।’