দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় পর্যটন খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার পর পর্যটনকেন্দ্রগুলো খাঁ খাঁ করছে। ব্যবসায়ীদের এক মাসে লোকসান গুনতে হয়েছে হাজার কোটি টাকা। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যটন মৌসুম। হরতাল-অবরোধের কারণে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এতে আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরতাল-অবরোধের কারণে অসংখ্য ট্যুর ও ট্রাভেলস প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। ফলে কর্মীদের বেতন অনেকেরই বন্ধ হয়ে গেছে।
ঝুঁকি নিয়ে কেউ ভ্রমণে আসতে চান না। এ জন্য হোটেল ও রিসোর্টগুলো সংকটের মধ্যে রয়েছে। কুয়াকাটায় প্রতিবছরই এ সময় পর্যটকদের ঢল নামে। এখানে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি স্থানীয় মানুষ পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়বেন। বছরজুড়ে সারা দেশের পর্যটন এলাকায় পর্যটকদের পদচারণে মুখর থাকে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে হরতাল বা অবরোধের কারণে কক্সবাজার এবং খাগড়াছড়ির উঁচু-নিচু পাহাড়, সর্পিল সড়ক এখন একেবারে ফাঁকা।
প্রকৃতির অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক নিদর্শন, সমুদ্রসৈকত- যা সব সময়ই গর্বের বিষয়। সারা বিশ্বের মোট পর্যটকের শূন্য দশমিক ৮ শতাংশের আগমন ঘটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এবং বাংলাদেশ শুধু তার ৪ শতাংশ পর্যটকের আগমন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশে যতসংখ্যক পর্যটক আসেন, তার ৬০ ভাগই আসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে। ইউরোপ থেকে বাংলাদেশে আসেন ১৬ ভাগ পর্যটক। ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড থেকে আসেন শতকরা ৯ ভাগ। বাকি পর্যটক আসেন পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৩ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। টাকা আকারে ৭৬ হাজার ৬৯০ কোটি। এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ১১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি মো. শিবলুল আজম কোরেশী খবরের কাগজকে বলেন, ‘পর্যটন খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪০ লাখ লোক কাজ করেন। যারা দীর্ঘ সময় এই খাতকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। ৭৮৫টি প্রতিষ্ঠান এই সংগঠনের সদস্য। রাজনৈতিক অস্থিরতায় এই শিল্পে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’ ২০১৩ ও ২০১৫ সালের টানা রাজনৈতিক সহিংসতার পর পর্যটন খাত ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আবার করোনার থাবায় বিপর্যস্ত হয় এ খাত। দেশে পর্যটনের ১ হাজার ৬৮টি গন্তব্য রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনশিল্পের মোট অবদান ছিল ৭ হাজার ৮৩৩ মিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ২ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২২ সালে দেশে বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন প্রায় ৫ লাখ ২২ হাজার।
পর্যটন একটি ব্যতিক্রমধর্মী রপ্তানি বাণিজ্য। অন্য বাণিজ্যে বিদেশে পণ্য পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হয়। কিন্তু পর্যটনের ক্ষেত্রে বিদেশিদের দেশ ভ্রমণে আকৃষ্ট করতে সেবার মানের ওপর আসে বৈদেশিক মুদ্রা। বিদেশি পর্যটক নিজের দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণে এসে থাকা-খাওয়া, যাতায়াত বিনোদন ইত্যাদিতে যে অর্থ ব্যয় করেন, তা সে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় হিসেবে অর্জিত হয়।
কক্সবাজার শহর ও আশপাশের পর্যটন এলাকায় পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল, রেস্টহাউস ও রিসোর্ট রয়েছে। এতে অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার পর্যটক থাকার সুবিধা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ৯০ শতাংশ হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউসের কক্ষ খালি পড়ে আছে। অথচ বর্ষা মৌসুমেও এর চেয়ে বেশি পর্যটক কক্সবাজার আসেন বলে জানান পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা। কক্সবাজারের পাশাপাশি প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনেও পর্যটক কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে চলাচলকারী তিনটি জাহাজে পর্যটন পরিবহন একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। পর্যটকদের সংখ্যাও দ্রুত কমেছে। ৯০ শতাংশ আবাসিক হোটেলের বুকিং বাতিল করা হয়েছে।
পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হোটেল, মোটেলসহ অন্যান্য সংস্থায় অর্জিত অর্থ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। পরিসংখ্যান বলছে, অন্য রপ্তানির তুলনায় পর্যটনশিল্প থেকে আয় দ্রুত বর্ধনশীল। একটি পর্যটন অঞ্চল গঠন ও উন্নয়নের ফলে সেখানে পর্যটকদের সমাগমের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি হয়। কম শিল্পায়িত এলাকায় পর্যটনশিল্পের বিকাশের ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা ওই এলাকার মানুষের জীবনমাত্রার মান উন্নত করে। পর্যটনশিল্পে অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটিয়ে বিশ্বের বহু দেশ প্রমাণ করেছে পর্যটন অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম। নেপাল, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, হংকং, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ অর্জিত হয় এ খাত থেকে।
জাতীয় অর্থনীতির বিকাশে পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন করতে হবে। শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংঘাতের পর একসময় পর্যটন খাতের চরম বিপর্যয় ঘটে। এরপর নতুন সরকার এসে এ খাতের উন্নয়নে ব্যাপক সংস্কার গ্রহণ করে। বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় পর্যটন খাত। এর ফলে প্রচুর বিদেশি পর্যটক আসতে থাকেন। বৈদেশিক মুদ্রাও এ খাতে বাড়তে থাকে। সুতরাং আমাদের দেশের পর্যটন খাতটিকে বাঁচাতে হলে বিরোধপূর্ণ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারকে দেশি-বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।