বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তকমা মুছে ফেলে উন্নয়নশীল দেশের এক নতুন কাতারে যুক্ত হতে চলেছে। বিগত এক দশকে উন্নয়নের ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। চোখে পড়ার মতো মেট্রোরেল স্বপ্নডাঙায় চড়েছে। গতি বেড়েছে। সময়ও সাশ্রয় হয়েছে। কর্ণফুলীর তলদেশে এক আশ্চর্য বাস্তবতা এখন টানেল। বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামোতে একেকটা পালক যুক্ত করার সময় এসেছে। চীন আমাদের অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও দিনে দিনে জোরদার হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে।
বাংলাদেশে চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ক্রমাগত বাড়ছে। তবে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা একতরফা কাজে লাগাচ্ছে চীন। কিন্তু বাংলাদেশ এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না।
জাতিসংঘের কমপ্রিহেন্সিভ গ্লোবাল ট্রেড (ইউএন কমট্রেড) ডেটা অনুযায়ী সর্বশেষ ২০২২ সালের হিসাবমতে, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ২৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৫০০ কোটি) মার্কিন ডলার। এর মধ্যে চীনের বাংলাদেশে রপ্তানি বছরে ২৪ বিলিয়ন (২ হাজার ৪০০ কোটি) ডলার। আর বাংলাদেশ থেকে আমদানির পরিমাণ মাত্র ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি পাহাড়সম।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন থেকে বাংলাদেশ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) পেয়েছে ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানিয়েছে, পাইপলাইনে আছে আরও প্রায় ১০ বিলিয়ন (১ হাজার কোটি) ডলার।
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের প্রতিশ্রুতি বিনিয়োগের মধ্যে সাড়ে ১০ বিলিয়ন (১ হাজার ৫০ কোটি ডলার) এযাবৎ বাংলাদেশ পেয়েছে। এ দেশে চীনের এসব বিনিয়োগ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) সম্পর্কিত। এসব অর্থ বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজে লাগাচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ সরকার ২০৪০ সাল নাগাদ ৬০৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরি করলেও দেশে নেট বিনিয়োগ প্রবাহ খুবই কম।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিসিসিআই) সেক্রেটারি জেনারেল আল মামুন মৃধা বলেন, ‘আমরা যে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবেশ তৈরিতে উন্নতি করেছি, তা কি চীন বা অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরা জানে? অনেক চেষ্টা করেও আমরা চীনে একটা বিনিয়োগ সম্মেলন করতে পারিনি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। আর বিডা যেসব দেশে সম্মেলনের আয়োজন করে, সেখানে রপ্তানি কম ও সম্ভাবনাও ক্ষীণ।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিডার সম্মেলন আয়োজন হয় হাই প্রোফাইলে। তাতে ট্যুর হয়, রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু প্রকৃত কাজ হয় না।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি ঝি মিঙ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চায়না-বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ কো-অপারেশন ফোরামের সভায় দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, ‘চীনের বৃহত্তর আমদানি মেলায় আপনারা অংশ নিন। চীনের আমদানিকারকদের চাহিদা জানুন। এরপর নিজেরা সেই পণ্য তৈরি করে চীনে রপ্তানি করুন।’ তিনি আরও বলেন, তার দেশ বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের অগ্রগতির যাত্রায় পাশে থাকতে চায়।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স বলছে, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে র্যাঙ্কিং ২০১৩ সালে ৫২তম স্থান থেকে ২০২৩ সালে ১২তম স্থানে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া অধিক সম্ভাবনা ও কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রথম স্থানে অবস্থান করছে।
বিসিসিসিআইয়ের সহসভাপতি বদরুল আলম খান বলেন, বাংলাদেশের প্রতি চীনের মনোযোগ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি। চীন সরকারের নীতি ইতিবাচক মনে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা চীনের বেসরকারি উদ্যোক্তার সংখ্যা ৩৫৫ জন। ব্যবসার মূল সূত্র সংস্কৃতিকে চেনা ও জানা, সেটিই চীন করছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান খবরের কাগজকে বলেন, ‘চীন আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তারা আমাদের অন্য অনেকের তুলনায় সহজ শর্তে অর্থ দেয়। ভবিষ্যতে আমাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যও আরও বাড়বে।’
যে বিষয়টি সবার আগে আমাদের বিবেচনা করা দরকার তা হলো, চীনে রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে চীন থেকে আরও বিনিয়োগ আনতে হবে। এ জন্য রেজিস্ট্রেশন, ডকুমেন্টেশন ও কর ব্যবস্থা আরও সহজ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে।