পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশে প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ রিপোর্ট প্রকাশ করে। সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ৪১ লাখ ৩৪ হাজার (৪৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ) এবং নারী ৮ কোটি ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭৮৪ জন (৫০ দশমিক ৪৬ শতাংশ)। পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি।
প্রাথমিক রিপোর্টে এই শুমারির জনসংখ্যা কম ছিল। তা ছিল ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬। বর্তমানে স্বাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৮০ শতাংশ, যা ২০১১ সালের শুমারিতে ছিল ৫১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ যাচাই-বাছাই করে নতুন যুক্ত হয়েছে প্রায় ৪৬ লাখ ৭০ হাজার ২৯৫ জন। প্রাথমিক হিসাবে বিভিন্ন কারণে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ বাদ পড়েছিলেন।
বিবিএস জানায়, সমন্বয়কৃত মোট জনসংখ্যার ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ গ্রামে এবং ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ শহরাঞ্চলে বাস করেন। সমন্বয়কৃত মোট জনসংখ্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে ৪ কোটি ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৬ জন বাস করেন।
জনশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে গ্রামে বাস করেন ১১ কোটি ৬১ লাখ, শহরে ৫ কোটি ৩৭ লাখ। সে হিসাবে গ্রামের জনসংখ্যা শহরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। যেখানে ২০১১ সালে ১৪ কোটি ৯৬ লাখ মানুষের মধ্যে গ্রামে বাস করতেন ১১ কোটি ৪৭ লাখ ও শহরে ৩ কোটি ৫১ লাখ।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে দেশে প্রথম জনশুমারি করা হয়। সে সময় জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৪ লাখ। ১৯৮১ সালের শুমারিতে তা বেড়ে হয় ৮ কোটি ৯৯ লাখ, ১৯৯১ সালের শুমারিতে জনসংখ্যা পাওয়া যায় ১১ কোটি ১৫ লাখ। সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৯৮ লাখ।
প্রতিবারেই জনশুমারির পর দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মধ্যে দেখা দেয় নানা ধরনের কৌতূহল। অনেকেরই ধারণা, সঠিক হিসাব উঠে আসে না জনশুমারি থেকে। এ ধারণা আরও জোরালো হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব থাকায়। দেখা দেয় বিভ্রান্তি।
সবশেষ জনশুমারির নতুন তথ্য প্রকাশের পর আবারও গরমিল দেখা গেছে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে। বিশেষ করে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা (২০২৩) উল্লেখ করা হয়েছে ১৭ কোটির ওপরে। অন্যদিকে জাতিসংঘেরই আরেক প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ জরুরি শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ৩১৯। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউতে বাংলাদেশের সর্বশেষ জনসংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ১৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭৭ হাজার ৮৫৩। এ ছাড়া আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবেও রয়েছে ভিন্নতা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো আমাদের দেশে জনশুমারি করে না। আমরা প্রতি ১০ বছর পর জনশুমারি করে সেই ফলাফল প্রকাশ করি। অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন সার্ভে করে অনুমিত জনসংখ্যা ব্যবহার করে। আমরা আমাদেরটাই গ্রহণ করব। এবার চেষ্টা করব আমাদের জনশুমারির ফলাফল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে সংযুক্ত করার।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে দেখেন নেতিবাচকভাবে। কারও কারও মতে, সরকারের তরফ থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জনসংখ্যাকেন্দ্রিক সমন্বয় যথাযথভাবে হয় না বলেই এমন বিভ্রান্তি থেকে যায়। এর প্রভাব পড়ে নানা ধরনের উন্নয়ন সহায়তার ওপর। এমনকি দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও এর প্রভাব পড়ে।
সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে আমাদের জনশুমারির তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তৈরি করা। জনশুমারির তথ্য আন্তর্জাতিক তথ্যভাণ্ডারে যেন সঠিকভাবে সন্নিবেশিত থাকে সে ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে তথ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভ্রান্তির সুযোগ থাকবে না।