খেটে খাওয়া মানুষের এখন নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, তার ওপর অসুস্থ হলে তো কথাই নেই! দেশে চিকিৎসা নেন না আড়াই কোটি মানুষ। অসুস্থতাজনিত সমস্যাকে মারাত্মক মনে করেন না ৮২ শতাংশ মানুষ। খরচের ভয়ে চিকিৎসা থেকে দূরে থাকেন ১৩ শতাংশ মানুষ। খবরের কাগজের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই তথ্য। দেশে মানুষের চিকিৎসার জন্য বছরে খরচ হওয়া প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার মধ্যে ৬৯ (৬৮.৫) শতাংশ যায় ব্যক্তি পর্যায়ের পকেট থেকে। বাকি ২৩ শতাংশ বহন করে সরকার, ৫ শতাংশ উন্নয়ন সহযোগী, ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাইভেট সেক্টর খরচ করে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা খরচ সামাল দিতে মানুষ দিনে দিনে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। সম্পদ বিক্রি কিংবা ধারদেনা করেও কুলোতে পারছেন না অনেকেই। ফলে চিকিৎসা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই নিজের অসুস্থতা গোপন করছেন। অনেকেই অসুস্থ বোধ করেও খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না রোগের বিষয়টিকে। ফলে একপর্যায়ে রোগ জটিল হয়ে মারাত্মক বিপদের মুখে পড়ছেন। শেষ সময়ে চিকিৎসার আওতায় গেলেও অনেককেই বাঁচানো যায় না।
বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে দেখা যায়, ৮২ শতাংশ মানুষ নিজের অসুস্থতাজনিত সমস্যাকে মারাত্মক মনে করছেন না। ১১ শতাংশ মানুষ কেবল খরচের ভয়ে চিকিৎসা করাতে যান না। প্রায় ২ শতাংশ মানুষ বাড়ি থেকে দূরত্বের কারণে চিকিৎসাকেন্দ্রে যান না। এ ক্ষেত্রেও খরচের পরোক্ষ চিন্তা থাকে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মোট হিসাবে প্রায় ১৩ শতাংশ বা আড়াই কোটি মানুষ খরচের ভয়ে চিকিৎসা থেকে দূরে থাকেন। বিবিএসের সর্বশেষ জরিপের ফলাফলে পুরুষের চেয়ে নারীরা খরচের ভয় বেশি করেন। অন্যদিকে চিকিৎসাকেন্দ্রের অবকাঠামোগত অনেক আধুনিকায়ন ও উন্নতি ঘটলেও বিনা মূল্যে সেবার ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। রাষ্ট্রকে বিষয়টি ভাবতে হবে। অর্থাৎ গরিবের চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। তাদের জন্য এখন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম চালু করা জরুরি। অনেক দেশেই এই কার্যক্রম চালু আছে। আমাদের দেশে এ ব্যবস্থা চালু হলে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম অনেকাংশে কমে যাবে। এ জন্য মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। উন্নতির সুফল সব মানুষ পান না। চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষ হয়রানির শিকার হন। বহুভাবে টাকা খরচ হয়। ফলে মানুষের অসুখ হলেও তারা এড়িয়ে যান। অনেকেই ওষুধ খেতে চান না। ডাক্তারের কাছেও যান না।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম লক্ষ্য থাকবে চিকিৎসাসেবাকে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে আরও কতটা সহজ ও নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা যায় সেদিকে।’
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘সরকার যদি দেশের ৪ কোটি পরিবারের প্রতিটির জন্য ১ লাখ টাকা করে সর্বজনীন পারিবারিক স্বাস্থ্য প্যাকেজ চালু করে (প্রিমিয়াম মুক্ত), তবে সবাই হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন। এতে চিকিৎসার ৯৫ শতাংশ কাভার হয়ে যাবে। বাকি ৫ শতাংশের জন্য বিমা কার্ড চালু করতে হবে প্রিমিয়াম ভিত্তিতে। তাতে অন্য সব জটিল রোগের সেবা সংকুলান হবে। সরকার উদ্যোগ না নিলে স্বাস্থ্যসেবায় বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না।’
অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের দেশের মানুষ চিকিৎসাসেবার সুফল পাচ্ছেন না। সেই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক রাহুগ্রাস থেকে এই সেক্টরকে মুক্ত রাখা প্রয়োজন। চিকিৎসায় ভোগান্তির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে দুর্নীতি তো আছেই। এসব বন্ধে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। চিকিৎসাসেবার গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। চিকিৎসার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি সরকার নিতে পারলে দরিদ্র মানুষ তাদের গুণগত সেবা পাবেন বলে আশা করা যায়।