সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে কয়েক দিন ধরে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ চলছে। তাদের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। গত ২৯ জানুয়ারি রাখাইন রাজ্যের মিনবিয়া শহরতলিতে জান্তা সেনাদের ৩৮০ লাইট পদাতিক ব্যাটালিয়নের আঞ্চলিক সদর দপ্তরটি দখলের দাবি করেছে আরাকান আর্মি (এএ)। এ সংঘর্ষের ঘটনায় হতাহত না হলেও আতঙ্কে রয়েছেন সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দাসহ আশ্রিত রোহিঙ্গারা।
মায়ানমারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে জান্তা বাহিনী। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কারাহ রাজ্যের খনিজসমৃদ্ধ শহর মাউচি দখলের দাবি করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী কারেনি ন্যাশনালিটিজ ডিফেন্স ফ্রন্ট। এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব মায়ানমারের কারেন প্রদেশের মায়াবদ্দি শহরে সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে বিদ্রোহী কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (কেএনএলএ)। এ ঘটনায় হেলিকপ্টারে থাকা জান্তা বাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলসহ পাঁচজন সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
আতঙ্ক কাটছে না সীমান্তের মানুষের। কয়েক দিন ধরে ওপারে তীব্র গোলাগুলির শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা। গত ২৫ জানুয়ারি বিকেল থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত উখিয়া উপজেলা সীমান্তের ওপারে দুই পক্ষের সংঘর্ষের একপর্যায়ে রহমতের বিল এলাকার স্থানীয় বাসিন্দার বসতঘরে একটি গুলি ও ১৩টি মর্টার শেল এসে পড়ে। এ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তুমব্রু সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কিছুদিন ধরে সীমান্তের ওপারে ব্যাপক গোলাগুলি হচ্ছে। আমরা যারা স্থায়ী বাসিন্দা আছি, সবাই খুব আতঙ্কে আছি। সীমান্তে বসবাসকারী অনেকেই ভয়ে নিরাপদে চলে গেছেন। বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে না যাওয়ার জন্য স্থানীয়দের সতর্ক করা হচ্ছে বলেও জানা যাচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে গত সোমবার এক দিনের জন্য সীমান্ত এলাকায় পাঁচটি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা আবারও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রেবেশের আশঙ্কা করছেন। সীমান্ত পরিস্থিতি প্রশাসন পর্যবেক্ষণে রেখেছে। বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সীমান্তে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তলাগোয়া ওপারে মায়ানমারের হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেছে। সীমান্তে কঠোর নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্কতামূলক প্রস্তুতি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম নাজমুল হাসান।
বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। বিজিবির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিজিবি সীমান্ত এলাকাজুড়ে কঠোর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। কয়েক দিন ধরে সীমান্ত এলাকায় শোনা যাচ্ছে গুলি ও মর্টার শেলের শব্দ। সীমান্তের ওপারে দেখা যায় আগুনের ধোঁয়া। এ সময় বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোয় মায়ানমারের হেলিকপ্টারকে টহল দিতে দেখা গেছে। বিশেষ করে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, তুমব্রু, বাইশফাঁড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যংসহ কয়েকটি পয়েন্টে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। আর এতেই কক্সবাজারের টেকনাক এবং উখিয়া উপজেলার ৩৩ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখানে উসকানি হিসেবে কাজ করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি, রাখাইনসহ আশপাশের অঞ্চলের আরও ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে টেকনাফ এবং উখিয়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি করতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এমন সব আশঙ্কা প্রকাশ করায় ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রাখাইনে মায়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিরোধের জেরে প্রাণ বাঁচাতে ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। অবশ্য এর আগেও বেশ কয়েকবার অনুপ্রবেশের মাধ্যমে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অবস্থানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখের বেশি।
সাম্প্রতিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি যাতে সহজে মোকাবিলা করা যায়, সে জন্য আর্মড পুলিশের পক্ষ থেকে চেকপোস্ট আরও বাড়ানো দরকার। সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা দরকার। সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কথা ভেবে সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে পেশাদারি মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সীমান্তের অতন্দ্রপ্রহরীরা যাতে যেকোনো মুভমেন্ট কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে জন্য নিয়মিত অপারেশনাল, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন।