ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ৭২ ধরনের পণ্য আমদানির অনুমোদন থাকলেও নিয়মিত পণ্য আমদানি হয় ২২টি। সেসব পণ্যের বেশির ভাগই কাঁচামাল ও ফল। তবে কয়েক মাস ধরে এই বন্দর দিয়ে কোনো ফল আমদানি হচ্ছে না। তা ছাড়া ভারত থেকে অন্য যেসব পণ্য আমদানি হয়, সেগুলো ভোমরা বন্দরে আসার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ খালাস করতে গড়িমসি করে। খালাস করতে দেরি হওয়ায় কাঁচামালগুলো ট্রাকে পচতে শুরু করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যবসায়ীরা। ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক এলেও তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২০০-এর নিচে। এ জন্য ব্যবসায়ীরা ডলারসংকট, বন্দরের অনুন্নত অবকাঠামো, ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও দক্ষ নেতৃত্বের অভাবকে দূষছেন।
বর্তমানে বন্দরটিতে আমদানি ও রপ্তানিকাজে জড়িত রয়েছেন ৫ শতাধিক ব্যবসায়ী। আগে প্রতিদিন এই বন্দরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। বছর শেষে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার মতো। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বন্দরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৮৫৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আমদানি কমে যাওয়ায় এবারও রাজস্ব পূরণ হওয়া নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হয়রানির কারণে এই বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া ডলারসংকটের কারণে ব্যাংকগুলো নিয়মিত এলসি (ঋণপত্র) দিতে পারছে না। আগে ১০ শতাংশ মার্জিনে ঋণপত্র খোলা যেত, এখন এলসি খুলতে হচ্ছে ১৫০ শতাংশে। আর টাকার মূল্যমান কমে যাওয়ায় এলসি খোলার সময় ডলার মূল্য ধরা হচ্ছে ১১৫ টাকা, অথচ বিল পাস হচ্ছে ১২৫ টাকার। এতে আমদানিকারকরা ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি কমে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে তারা যে বন্দরে সুবিধা পাবেন সেই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি করবেন। ভোমরা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। তাই ভোমরা বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তারা। অবকাঠামো উন্নয়নের ধীরগতি ও বন্দরের কাস্টমস অফিস, শ্রমিক ইউনিয়ন, ব্যবসায়িক সংগঠন- এই তিনটি বিভাগের সমন্বয়হীনতার কারণে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তারা। বেনাপোলসহ অন্য বন্দরে ব্যবসায়ীদের যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, সে তুলনায় ভোমরা বন্দরে ব্যবসায়ীরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। বেনাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি করায় ভোমরা বন্দরের আমদানি কমেছে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষ বলে, ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানি কমে যাওয়ার পেছনে শুধু ডলারসংকট দায়ী নয়। দেশের অন্য বন্দরগুলোতে আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। এখানে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে তাদের সর্বস্ব হারান। এ জন্য অনেকে এই বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে আমদানি কার্যক্রমে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বন্দরে ব্যবসা-বাণিজ্য খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। ভোমরা বন্দর দিয়ে ব্যবসায়ীদের সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমোদন নেই। বর্তমানে এই বন্দর দিয়ে আমদানি করা পণ্যের চাহিদা দেশের বাজারে না থাকায় ব্যবসায়ীরা অন্য বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। আর এসব কারণে বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য আমদানি কমেছে।
ভোমরা কাস্টমসের শুল্ক স্টেশনের ডেপুটি কমিশনার মো. এনামুল হক খবরের কাগজকে জানান, পণ্যের চাহিদার ওপর আমদানি কমবেশি হয়। ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ এলসি করবেন, তার বিপরীতে পণ্য আমদানি হয়। এখানে কাস্টমসের কোনো কিছু করার নেই।
ব্যবসায়ীদের প্রতি হয়রানির যে অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে সিন্ডিকেটের কবল থেকে তাদের মুক্ত রাখতে হবে। আমদানিকারকরা কী ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তা বন্দর কর্তৃপক্ষকে খতিয়ে দেখতে হবে। বন্দরের আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বন্দরের কাস্টমস অফিস, শ্রমিক ইউনিয়ন, ব্যবসায়িক সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে বন্দরের উন্নতি আশানুরূপ হবে না। সরকারের রাজস্ব বাড়াতে হলে ভোমরা স্থলবন্দরটির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।