হাদিসে ‘সালাত আদায় করা’র কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে ‘কায়েম করা’র কথা। কারণ গড়পড়তা সালাত আদায় শরিয়তে কাঙ্ক্ষিত নয়। বরং সালাতকে সত্যিকার গাম্ভীর্যের সঙ্গে রুকন, ওয়াজিব ও শর্তসমূহসহকারে যথাযথভাবে পালন করা কাম্য। সেটাও হতে হবে একান্তভাবে কেবল আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে। পক্ষান্তরে যদি কেউ শুধু বাহ্যিকভাবে সালাত আদায় করে, যেমন- রুকু করল, সিজদা করল; কিন্তু স্থিরতার ধার ধারল না, ওজর ছাড়াই নির্দিষ্ট সময় থেকে সালাতকে বিলম্ব করল, জামায়াত ছেড়ে দিল, এ ব্যক্তি যেন সালাত আদায়ই করেনি।
এমন সালাত আদায়কারীর সালাতের দুই অবস্থা হতে পারে। হয়তো তার সালাত আদায়ই হয়নি এবং বাতিল হয়ে গেছে। অথবা সালাত অপূর্ণ রয়ে গেছে। কারণ, সে জামায়াত ছেড়ে দিয়েছে। অথবা নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করেনি। আর যে ওজর ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর সালাত আদায় করে না, তার সালাত বাতিল। কারণ সে আল্লাহ যেভাবে নামাজ আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবে আদায় করেনি। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই সালাত মুসলিমদের ওপর তার নির্ধারিত সময়ে ফরজ। (সুরা নিসা, ১০৩)
সুতরাং, আল্লাহতায়ালা যে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন তার ব্যতিক্রম হলে সে সালাত তিনি কবুল করবেন না। অতএব, কেউ যদি সে সালাত ভিন্ন সময়ে আদায় করে, সে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক সালাত আদায় করতে পারেনি। বরং তার মন যেভাবে চেয়েছে সেভাবে আদায় করেছে। হ্যাঁ, যদি কেউ প্রচণ্ড ঘুমে বিভোর হয়ে থাকে, অথবা একেবারেই ভুলে যায়, অথবা তার পরিস্থিতি এমন হয়, যে পরিস্থিতিতে যোহর ও আসরের সালাত বা মাগরিব ও এশার সালাত এক সঙ্গে আদায় করা বৈধ হয়, তা হলে এসব ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। এসব ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের পর সালাত পড়া হলেও সালাত আদায় হয়ে যাবে। কারণ সে মাজুর।
আর যে ব্যক্তি কোনো ওজর ছাড়াই জামাত ছেড়ে দেয়, অথবা কোনো ওজর ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের পর সালাত আদায় করে, সে তার সালাতকে বিনষ্টকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে সালাত বিনষ্ট করা মানে সালাত ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং সালাতের নির্দিষ্ট সময়কে বিনষ্ট করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, অতঃপর তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত হলো এমন অপদার্থরা, যারা সালাতকে বিনষ্ট করে (ফেললসুরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৯)
অর্থাৎ তারা সালাতকে যথাসময় হতে বিলম্বে আদায় করত। এ ব্যাখ্যার একটা প্রমাণ কোরআনের অপর এক আয়াত। সুতরাং দুর্ভোগ সে সালাত আদায়কারীদের- যারা নিজেদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন। (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৫)। আয়াতে তাদেরকে ‘সালাত আদায়কারী’ বলে ব্যক্ত করা হয়েছে এবং সালাত আদায় করা সত্ত্বেও তাদের প্রতি দুর্ভোগের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর কারণ, তারা তাদের সালাতের ব্যাপারে উদাসীন। আর সালাতের উদাসীনতার অর্থ হলো সময় গড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ওজর ছাড়াই সালাতকে বিলম্ব করা। এই সেই সালাত, যা আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এ সালাতই বাতিল সালাত।
আর যে সালাত একেবারেই ছেড়ে দেয়, বিলম্বেও আদায় না করে, তার ঈমান পূর্ণাঙ্গ নয়। কারণ, সে ইসলামের একটি মৌলিক রুকন ও স্তম্ভ ভেঙে ফেলেছে। যা কালিমায়ে শাহাদাতের পরই ইসলামের দ্বিতীয় রুকন। যা ইসলামের ভিত্তি। যেমন হাদিস থেকে আমরা জেনেছি।
অতএব, ইসলামে সালাতের মর্যাদা সুমহান। যার অন্তরে ইসলামের আলো আছে, সে সালাত আদায়ে অবহেলা করতে পারে না। মুসলিমদের উচিত, সালাত বিষয়ে পরিপূর্ণ মনোযোগী হওয়া। যথাসময়ে তা আদায় করা। যথাসময়ে ও পূর্ণ মনোযোগে আদায় করা সালাতই ‘উপকারী সালাত’-এর মর্যাদা লাভ করে। যার মাধ্যমে মানুষ দায়মুক্ত হতে পারে।
আর যে নিজের খেয়ালখুশিমতো সালাত পড়ে, সালাতের সময় আসন্ন জেনেও ঘুমিয়ে পড়ে; ভাবে, ঘুম ভাঙলে পড়ে নেব। ফজর পড়ে সূর্যোদয়ের পর; অথবা দিনের সালাতগুলো জমিয়ে রেখে এক সঙ্গে রাতে সব আদায় করে আর বলে, আল্লাহ বিক্ষিপ্ত সময়ে পড়া সালাত কবুল করবেন, তিনি এক সঙ্গে পড়া সালাতও কবুল করবেন নিশ্চয়ই। তার এমন চিন্তা নিঃসন্দেহে বাতিল। এটা আল্লাহতায়ালার সঙ্গে ঠাট্টা করার নামান্তর। নাউযুবিল্লাহ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক