বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে গঠিত প্রতিষ্ঠানটি ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ বা ‘দুদক’ নামে পরিচিত। দুদক দুর্নীতির বিষয়ে সচেতনতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য সুশীল সমাজ, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা এবং মিডিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংস্থাটির কাজ হচ্ছে দুর্নীতি ও দুর্নীতিমূলক কাজ প্রতিরোধ করা। কয়েক বছর ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনকে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজ ঘরের দুর্নীতি ঠেকানো। দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের গুরুদায়িত্ব যাদের কাঁধে তারাই এখন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। কথায় বলে না- সরষের মধ্যেই ভূত, সেই ভূত তাড়াবে কে!
দুর্নীতি দমন কমিশনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে সংস্থাটি। পিয়ন থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আসছে ঘুষ, প্রতারণা, ভয় দেখানো ও চাঁদাবাজির বিস্তর অভিযোগ। খবরের কাগজ পত্রিকার অনুসন্ধানে সে তথ্যই বেড়িয়ে এসেছে। ২০০৮ সালে দুদকের আলাদা চাকরিবিধি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়। সেই থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছরে ২২৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের, বাধ্যতামূলক অবসর, পদ অবনমন এবং বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়। পিয়ন থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ জনকে চাকরিচ্যুত এবং বাকিদের বাধ্যতামূলক অবসরসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবাজ দমনে এখন কঠোর অবস্থানে কমিশন। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে হয়রানির শিকার হওয়া মানুষের অভিযোগ খতিয়ে দেখার বিষয়টি জোরদার করা হয়েছে।
যদিও দুদকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকেই এ ধরনের অভিযোগ উঠে আসছে। দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সালে দুদক চাকরিবিধি প্রণয়ন হওয়ার পর শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ওই বছরেই ৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তির আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে চারজন চাকরিচ্যুত হন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে ৯৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়া হয়। চাকরিচ্যুত হন ১৮ জন। ২০১৪ সালে ১২ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০১৫ সালে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে ১৪ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর মধ্যে দুজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০১৭ সালে ১৫ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একজন চাকরিচ্যুত হন। ২০১৮ সালে চারজনের মধ্যে তিনজন চাকরিচ্যুত হন, ২০১৯ সালে ৩৬ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। দুজন চাকরিচ্যুত হন। ২০২০ সালে তিনজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলেও চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেনি। ২০২১-এ কোনো বিভাগীয় মামলা হয়নি। ২০২২ সালে একজনের চাকরিচ্যুতিসহ তিনজনকে শাস্তি দেওয়া হয়।
বিভিন্ন সময়ে ঘুষ লেনদেনে জড়িত থাকায় ডিবির হাতে আটক দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারী। দুদকের মহাপরিচালকের (মানি লন্ডারিং) পিএ গৌতম ভট্টাচার্য তার তিন সহযোগীসহ ঘুষের দেড় লাখ টাকা নেওয়ার সময় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ধরা পড়ে জেলহাজতে যান। তারা ঢাকার উত্তরার ব্যবসায়ী আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ভুয়া অভিযোগের চিঠি তৈরি করে তা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলে ঘুষ দাবি করেছিলেন।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী পরিমল ধরকে দুদকের ভুয়া অভিযোগ দেখিয়ে তা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন দুদকের কুমিল্লা কার্যালয়ের সহকারী উপপরিদর্শক (এএমআই) কামরুল হুদা। এ বিষয়ে পরিমল থানায় মামলা করেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে ছুটে গিয়ে ঘুষ নিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন কামরুল হুদা। চাঁদাবাজি মামলায় তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
দুদকের ইতিহাসে বহুল আলোচিত ছিল দুর্নীতি মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানের কাছ থেকে দুদক পরিচালক এনামুল বাছিরের ২৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার ঘটনা। ২০১৯ সালের আলোচিত এ ঘটনায় এনামুল বাছিরের চাকরিচ্যুতি হয় এবং দুদকের দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় আট বছরের কারাদণ্ড হয়। রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন, বর্তমানে তিনি জামিনে আছেন। দুদক উপপরিচালক শরীফ উদ্দিনকে অপসারণের ঘটনা বেশ আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। দুদকের চাকরিবিধির ২০০৮-এর ৫৪(২) ধারার ক্ষমতাবলে কমিশন সরাসরি তাকে অপসারণ করে। বিষয়টি নিয়ে তার সহকর্মীরা দুদকের প্রধান কার্যালয়ে মানববন্ধনও করেন। বিষয়টি দুদকের ভাবমূর্তিতে অনেকটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এ বিষয়ে দুদক সচিব মাহবুব হোসেন খবরের কাগজ-কে বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমনে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিশন। শৃঙ্খলাভঙ্গ, অনিয়ম, দুর্নীতি অথবা চাকরিবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনোরকম ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ পেলেই তদন্তসাপেক্ষে চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজ-কে বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করে, সে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশন বাংলাদেশের একটি স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ইউনিটকে শক্তিশালী করা ও জনগণের আস্থা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি একবিন্দু ছাড় নয়, অর্থাৎ অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে সৎ, মেধাবী ও সাহসী কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। যাতে প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে হয়রানির শিকার বা অপসারণ হতে না হয়, সেদিকটাও কমিশনকে খেয়াল রাখতে হবে।