অমিত সম্ভাবনার ক্ষেত্রে মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পাল্টে দেবে দুর্গম দ্বীপের চিত্র। ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে ব্যবসা-বাণিজ্যের। গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে তৈরি হচ্ছে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ও রেলপথ। সংযোগ ঘটবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেও। আমাদের সম্ভাবনার এ অঞ্চলকে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
বর্তমান সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর অন্যতম হচ্ছে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহায়তায় এটি নির্মিত হচ্ছে। এ জন্য সরকার মহেশখালীর সাগরতীরের মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ৪১৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে। সূত্রমতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে প্রতিদিন ১০ হাজার টন ও প্রতিটি ইউনিটে ৫ হাজার টন কয়লা লাগবে। এখন পর্যন্ত দুই লাখ টন কয়লা সংগ্রহ করা হয়েছে।
সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর অন্যতম মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। পাঁচ বিদেশি পরামর্শক ও প্রকৌশলীর সহযোগিতায় এটি বাস্তবায়ন করছে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, জাহাজ থেকে সরাসরি ট্যাংকে কয়লা আনলোড করার জন্য প্রকল্প এলাকায় দুটি জেটির পাশাপাশি ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন স্টোরেজ ক্ষমতার চারটি ট্যাংক ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে। ট্যাংকগুলো ৬০ দিনের জন্য কয়লা সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। ৬০০ মেগাওয়াট করে দুই ইউনিটে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে গেছে একটি ইউনিট। জাতীয় গ্রিডে এই ইউনিট থেকে ইতোমধ্যে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহও করা হয়েছে। আগামী মার্চের দিকে আরও ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের আশা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের।
কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের প্রথম ইউনিট জানুয়ারিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে। দ্বিতীয় ইউনিটে শুরু হবে আগামী জুলাই মাসে। ৫১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোর্ট ও ভৌত অবকাঠামোর কাজ ইতোমধ্যে ৮২ শতাংশ ও সার্বিক ভৌত অবকাঠামোর কাজ ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় জাহাজ থেকে কয়লা খালাসের সুবিধার্থে গভীর সমুদ্রবন্দরও নির্মাণ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে কয়লা খালাসের জন্য জেটির কাজও শেষ হয়েছে। জেটিতে জাহাজও চলাচল শুরু করেছে।
এ বন্দর চালু হলে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও কলম্বো বন্দরের ট্রান্সশিপমেন্ট না নিয়ে সরাসরি মাদার ভেসেলে কার্গো পরিবহন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘পণ্য মাদার ভেসেলে তুলে দিলে সরাসরি চলে যাবে ইউরোপ, আমেরিকায়। ভবিষ্যতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর হয়ে উঠবে ট্রান্সশিপমেন্ট হাব।’
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০ হাজার টন পণ্য নিয়ে ভিড়বে জাহাজ। সমুদ্রের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সাড়ে ১৪ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ ওয়াল। এই ওয়াল নোঙর করা মাদার ভেসেলকে বাঁচাবে সমুদ্রের বড় ঢেউ থেকে। এটি মূলত গভীর সমুদ্রবন্দরের নিরাপত্তা দেয়াল। অনেক দূর থেকে চোখে পড়ার মতো স্থাপনা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।
মাতারবাড়ী বন্দর পুরোদমে চালু হলে দেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে ২ থেকে ৩ শতাংশ অবদান রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে বাণিজ্যিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশের প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে। অর্থনীতির নতুন দ্বার উন্মোচন হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল ভিড়তে পারার সুবিধা নিতে পারবে আশপাশের দেশগুলোও। আগামীতে অর্থনীতির নতুন দ্বার উন্মোচন হবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরেই। এই বন্দর হবে দেশের স্বর্ণদ্বার। দেশের রাজস্ব আদায়ে এটি হবে এক অমিত সম্ভাবনা।