যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপের উদ্যোগ থেমে যাওয়ার মধ্যেই বুধবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি না, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, আসন্ন এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে ২০১৪ সালের মতো আবারও একটি টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কারণ এই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোর অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কম। ওই দলগুলো এখন নির্বাচন ঠেকাতে সর্বাত্মক আন্দোলনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এতদিন নানা আশা-নিরাশার দোলাচল থাকলেও সংলাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ নাকচ হওয়ায় সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান গতকালই স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠকের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত বুধবার জানিয়েছেন, এখন আর সংলাপের সুযোগ নেই। এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করায় দেশের রাজনীতিতেও নতুন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এর ফলে আগামী দুই মাস দেশের রাজনীতিতে টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করতে পারে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে।
সূত্রমতে, বিএনপি-জামায়াতসহ সমমনা দলগুলো শুধু ছুটির দিন বাদ দিয়ে ‘সকল কার্যদিবসে’ লাগাতার কর্মসূচি পালন করবে। নির্বাচনের আগে শুরু হওয়া এই আন্দোলন নির্বাচনের পরও অব্যাহত রাখা হবে।
এ প্রসঙ্গে ড. এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘একদিকে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে ফেলেছে, অন্যদিকে বাইরের উদ্যোগে সংলাপের আহ্বান করা হচ্ছে। আবার ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখন আর সময় নেই, সুযোগ নেই। তফসিল ঘোষণার পর কোনো কোনো দল হরতাল ডেকেছে, প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই এখন বলা মুশকিল পরিস্থিতি কোন দিকে যায়। এক কথায় বলতে পারি ভালো কিছু হবে বলে মনে হয় না। নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক, রাজনৈতিক দলগুলোকে হতে হবে দায়িত্বশীল।’
এদিকে ডোনাল্ড লুর চিঠি পাওয়ার পর কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করে পিটার হাসসহ ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। উদ্দেশ্য, সংলাপ ভণ্ডুল করার দায় যাতে বিএনপির ওপর না বর্তায়। ফলে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কী করে, সেই অপেক্ষায় রয়েছে বিএনপি।
গত বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। তফসিল অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি (রবিবার) নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রত্যাখ্যান করে হরতালের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। অপরদিকে আওয়ামী লীগ করে আনন্দ মিছিল।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরগরম ঢাকার রাজনীতি। নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। অপরদিকে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা আত্মগোপনে থাকলেও আন্দোলনের পাশাপাশি রয়েছে তাদের নির্বাচনের প্রস্তুতিও। আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা, তারপর নির্বাচনে যাওয়ার কথা বলছেন তারা। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলেই যাবে বিএনপি। আর তাহলেই দলের মনোনয়ন চাইবেন তারা। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয়ী হবেন, এমন কথা বলছেন দলের নেতারা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, ‘জাতি হিসেবে আমরা শাঁখের করাতের মতো অবস্থায় পড়েছি। এটা ঠিক যে, সাংবিধানিক ধারা অনুসারে নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই নির্বাচন মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে? আন্তর্জাতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। শুধু আওয়ামী লীগেরই এই দায় না। বিরোধী হিসেবে বিএনপি যা করছে, সেটিও ঠিক করছে না।’
দেশের রাজনৈতিক সংকট দূর করতে হলে সবার আগে দরকার সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ সৃষ্টি করা। ৭ জানুয়ারি ২০২৪ যেহেতু নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে, সে ক্ষেত্রে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু করার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, এটিই এখন সবার প্রত্যাশা।