রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প অনেকেই চেনেন বিহারি ক্যাম্প নামে। এই ঘিঞ্জি পরিবেশে গড়ে উঠেছে রাজধানীর সবচেয়ে বড় মাদকের বাজার। এখানে ৪০ হাজারের মতো মানুষের বসবাস।
জেনেভা ক্যাম্পের সামনের সড়ক, যেখান থেকে এপিবিএনের অফিস মাত্র ১০০ গজ দূরে। সেই রাস্তাতেও চলে প্রকাশ্যে গাজার ব্যবসা। এই ক্যাম্পের প্রবেশমুখের উত্তর পাশে ও আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, স্কুল-কলেজপড়ুয়ারা এখন তাদের প্রধান কাস্টমার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদক দেশের তরুণসমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আগে মাদক কেনা, ব্যবসা ও সেবনের ক্ষেত্রে অনেক গোপনীয়তা রক্ষা করা হতো। এখন অনলাইন-ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ আছে, গ্রুপ আছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা মাদক বাসায় পৌঁছে দেয়।
ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, ক্যাম্পের ইয়াবা ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানি রাজুর হাতে। বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে বিভিন্ন সময় ক্যাম্পে আসেন তিনি। তার সহযোগীরা রাতে এসে সারা দিনের মাদক বিক্রির টাকা নিয়ে যান। রাজু জেনেভা ক্যাম্পকে ঘিরে গড়ে তুলেছেন ‘ইয়াবা সাম্রাজ্য’। তার সিন্ডিকেটের কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যান রাজু।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর জেনেভা ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও র্যাবের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার হন ২৩৭ জন। উদ্ধার করা হয় ১৫ হাজার ইয়াবাসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। এরপর ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি মাদক কারবারিকে ধরতে গিয়ে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের রোষানলে পড়ে পুলিশ। অনেক সময় অবরুদ্ধ থাকার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্যরা গিয়ে আসামিসহ পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে আনেন।
ক্যাম্পের এসপিজিআরসি গলিতে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়। ইশতিয়াক ও পঁচিশের মৃত্যুর পর পারিবারিকভাবে যারা শক্তিশালী, তারা ক্যাম্পে নিজেদের মতো জায়গা ভাগ করে মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্যাম্পের আটটি স্থানে চলে মাদকের কারবার। খবরের কাগজের প্রতিবেদনে এ তথ্যই উঠে এসেছে। ইয়াবা ডন পাকিস্তানি রাজুর বিষয়ে জানা যায়, তিনি বিভিন্ন জায়গায় ছদ্মবেশে পালিয়ে থাকেন।
গোয়েন্দা তথ্যমতে, জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারিরা সংঘবদ্ধ। ভেতরে অসংখ্য অলিগলি থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করে ক্যাম্পের বাইরে আনা কঠিন। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এখানে মাদক কারবারিদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানে খুচরা বিক্রেতা গ্রেপ্তার হলেও গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যান।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেনেভা ক্যাম্পে কয়েক দফা বড় অভিযানে মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের পরও বন্ধ হয়নি মাদক কারবার। ঢাকার বাইরে থেকে আসা মাদকের বড় মজুতখানাও এই ক্যাম্প। মাদককে কেন্দ্র করে ক্যাম্পে খুনোখুনির ঘটনাও অহরহ ঘটেছে। মোহাম্মদপুর এলাকাজুড়ে শতাধিক মাদকের স্পট রয়েছে।
সম্প্রতি ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও টাকা ভাগাভাগি নিয়ে মুরগিপট্টিতে সংঘর্ষে জড়ান বিহারিরা। এ ছাড়া অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব খাটাতেই সংঘর্ষে লিপ্ত হন তারা।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার এইচ এম আজিমুল হক বলেন, ‘ক্যাম্প ঘিরে বিভিন্ন সময়ে শতাধিক মামলা হয়েছে। ধরার পর অনেকে জামিনে বেরিয়ে যান। যারা জামিনে আসেন তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্পের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারি ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক হোতা দেশের বাইরে এবং কারাগারে বসেও ব্যবসা পরিচালনা করছেন। মাদকের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এটা চলতেই থাকবে।