রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গত শনিবার সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কারণে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে কুমিল্লার একটি পোশাক কারখানার শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলে ফাটলের পাশাপাশি শিক্ষার্থী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার আট কিলোমিটার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে।
গবেষকদের তথ্য মতে, বিশ্বে বছরে গড়ে ৬ হাজার ভূমিকম্প হয়। সাধারণত ভূপৃষ্ঠের হঠাৎ পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা শিলাচ্যুতির কারণে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ভূ-অভ্যন্তরে স্থিত গ্যাস যখন ভূ-পৃষ্ঠের ফাটল বা আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে তখন সেই গ্যাসের অবস্থানটি ফাঁকা হয়ে পড়ে আর পৃথিবীর ওপরের তলের চাপ ওই ফাঁকা স্থানে দেবে গিয়ে ভারসাম্য বড়ায় রাখে। তখনই ভূ-পৃষ্ঠে প্রবল কম্পন অনুভূত হয়।
খবরের কাগজের তথ্য মতে, রাজধানীসহ সারা দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরুপণ ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র ট্রাস্ট গঠন করা হচ্ছে। এ বছরের মার্চ মাসে নেওয়া একটি খসড়া প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করে গত বৃহস্পতিবার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ সপ্তাহেই এ প্রস্তাব পাঠানো হবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে। এরপর মন্ত্রিসভায় তোলা হবে অনুমোদনের জন্য। ট্রাস্ট গঠনের একটি উদ্দেশ্য হলো প্রকল্পের আওতায় মহাখালীতে একটি পূর্ণাঙ্গ ভবন নির্মাণ ও ল্যাব স্থাপন। এ জন্য প্রয়োজনীয় টেকনোলজি ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। এখন এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে এর পরিচালনা করতেই ট্রাস্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ট্রাস্ট স্বতন্ত্রভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সরকারি ও বেসরকারি ভবনের ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সুপারিশ করবে এ ট্রাস্ট।
আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হয়। সমীক্ষায় বলা হয়, ঢাকায় ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে গত ৬ ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের ভয়াবহতা ছাড়িয়ে যাবে। ধসে পড়বে ৮ লাখ ৬৫ হাজার ভবন। এ তালিকায় বহুতল পাকা ভবন ও একতলা বাড়ি ছাড়াও রয়েছে টিনশেড পাকা দালানের আবাসিক ও কারখানা ভবন। আর দিনের বেলায় এ মাত্রায় ভূমিকম্প হলে মারা যেতে পারে ২ লাখ ১০ হাজার মানুষ। টাকার অঙ্কে স্থাপনা, ভবন ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুমিত হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বা ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা পুনর্নির্মাণে ব্যয় হবে ৪৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
বিবিএস পরিসংখ্যান ২০২২-এ বলেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে বাস করে ১ কোটি ২ লাখের বেশি মানুষ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বলছে, ঢাকা মহানগরীতে জনসংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ এবং এর মধ্যে ৩৫ লাখ বস্তি ও নিম্নমানের আবাসিক ব্যবস্থায় বসবাস করে। ঢাকা মহানগর অধিক ঘণবসতিপূর্ণ হওয়ায় ভূমিকম্পে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ট্রাস্ট আগামী তিন বছরের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর সব ভবনের কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা চূড়ান্ত করবে এবং সেগুলোর জন্য ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে ভবন অপসারণ বা রেক্টোফিটিংয়ের সুপারিশ করবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকৃত অর্থে ঢাকায় দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা চিহ্নিতকরণের কাজ কখনোই হয়নি।
রাজউক শুধু নকশা অনুমোদনের কাজ করে থাকে।’ ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ড হলেও মানুষের অস্থিরতায় ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। ভূমিকম্প হলে মানসিকভাবে অস্থির না হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। তাহলেই ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।